সুনামগঞ্জে সরকারি ইজারাকৃত জলমহাল লুটের হিড়িক পড়েছে। প্রকাশ্যে মাইকে ঘোষণা দিয়ে হাজার হাজার মানুষ নিয়ে কোটি কোটি টাকার জলমহাল লুটপাটের মহোৎসব চলছে। গত ১৯ ফেব্রুয়ারী শাল্লা উপজেলার আন্ধারাইন জলমহাল থেকে প্রায় ৬০ লাখ টাকার মাছ লুট করেছে কয়েক হাজার মানুষ। এরপরদিনই ২০ ফেব্রুয়ারী মব সৃষ্টি করে শান্তিগঞ্জ উপজেলায় রাতের আঁধারে টর্চ লাইট জ্বালিয়ে জলমহালের আরো অর্ধকোটি টাকার বেশি মাছ লুট করা হয়েছে। আশপাশের ৭—৮ গ্রামের হাজার মানুষ একযোগে জলমহালে প্রবেশ করে ৬০ থেকে ৭০ লক্ষ টাকার মাছ লুট করে নেওয়ার অভিযোগ উঠে।
এসব কর্মকান্ডে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। যেখানে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহন করার পরপরই ঘোষণা দিয়েছেন দেশে আর মব সৃষ্টি করে জনগনকে বিপদে ফেলা যাবে না। মবসৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। সেই সুবাধে সুনামগঞ্জের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। প্রশাসনের চোখের সামনেই মব সৃষ্টি করে কোটি কোটি টাকার জলমহাল লুটপাট করা হচ্ছে। অথচ এসব মব ঠেকাতে প্রশাসনের কার্যকরী কোনো ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি। কোটি কোটি টাকার জলমহাল লুটের ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলেও প্রশাসন এসব ঘটনার কিছুই জানেন না। তাই এসব মব আর সরকারি ইজারাকৃত জলমহাল লুটের কার্যক্রম বন্ধ করতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে সচেতন মহলে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শাল্লা উপজেলার বৃহৎ জলমহাল আন্ধারাইন। উপজেলার শাল্লা ইউনিয়নের শিমেরকান্দা গ্রামের উত্তর-পূর্ব দিকে এই জলমহালটি। জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন ২০ একরের বেশি আয়তনের এই জলমহালটি ৬ বছর মেয়াদে ইজারা নিয়েছে শিমেরকান্দা মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি। প্রতি বছর সাড়ে ৫ লাখ টাকা ইজারা প্রদান করা হয়। এই বছর জলমহালটি পাইল (মাছ বড় করার জন্য অভয়াশ্রম হিসেবে সংরক্ষণ রাখা) ছিল। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার (১৯ফেব্রুয়ারী) সকালে জলমহালের পাশের শিমেরকান্দা, শ্রীহাইল, ধামপুর, মনুয়া গ্রামসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের ২/৩ হাজার মানুষ হঠাৎ করে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত মাছ লুট চালায়। জালসহ বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম দিয়ে ছোট-বড় প্রায় অর্ধকোটি টাকার মাছ লুট করে নিয়ে যায়।
শাল্লা থানার ওসি মো. রোকিবুজ্জামানের সাথে কথা হলে তিনি জানান, খবর পেয়ে পুলিশ পাঠিয়ে চেষ্টা করেছিলাম মাছ ধরা ঠেকাতে কিন্তু সম্ভব হয়নি। অনেক মানুষ একসঙ্গে জলমহালে নেমে মাছ ধরেছে। তাই হাজার হাজার মানুষ হওয়ায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঠেকানো সম্ভব হয়নি। তবে ইজারাদারের কাছ থেকে অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে শান্তিগঞ্জ উপজেলায় শুক্রবার ইফতারের পর থেকেই জাল, পলো, টেটা সহ মাছ ধরার নানা উপকরণ নিয়ে জলমহাল সীমানায় ভিড় করতে থাকেন শান্তিগঞ্জ উপজেলার কাওয়াজুরী, উফতিরপাড়, লাউগাঙ্গ, দিরাই উপজেলার নগদিপুর, ছোট নগদিপুর, ধীতপুর, ফুকিডর ও দৌলতপুর গ্রামের হাজারো মানুষ। পরে মব সৃষ্টি করে জলমহালের পাহারাদারকে সরিয়ে চালানো হয় লুটপাট।
ইজারাদার আঙ্গুর মিয়া জানান, ছয় মাস আগে শান্তিগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের অধীনে খাস কালেকশনের মাধ্যমে ১৬ লাখ টাকা রাজস্ব দিয়ে কাওয়াজুরী জলমহাল ইজারা নেন। জলমহালের রক্ষণাবেক্ষণ, পোনা অবমুক্তকরণ ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনায় তিনি আরও প্রায় ২৪ লাখ টাকা ব্যয় করেন। মাছ ধরার সময় আসলে আহরণের আগেই জলমহালের সকল মাছ পরিকল্পিত ভাবে লুটে নিয়ে যায়। এতে কম হলেও ৬০ থেকে ৭০ লক্ষ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তিনি। ভবিষ্যতে যেন এই জলমহাল কেউ ইজারা নেওয়ার সাহস না দেখায় তাই পরিকল্পিতভাবে এমন লুটপাট করানো হয়েছে বলে অভিযোগ তার।
মব সৃষ্টি করে হাজার হাজার মানুষ মাছ লুট হলেও কিছুই জানে না পুলিশ।
শান্তিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মোঃ অলি উল্যাহ জানান, মাছ লুটপাটের ব্যাপারে কিছু জানি না। জলমহালের ইজারাদার বা সংশ্লিষ্ট কেউ এখনো আমাদের এই ব্যাপারে জানায় নি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









