রাত গভীর হলে চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে আসে। কিন্তু একটি ভাঙা ঘরের ভেতরে তখনও ঘুম আসে না দু’টি ক্লান্ত চোখে। টিনের ফাঁক গলে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকে পড়ে, শীতল ছোঁয়ায় কেঁপে ওঠে বৃদ্ধ শরীর। বৃষ্টির রাতে সেই শব্দ আরও তীব্র—টুপটাপ পানি পড়ে মাচার ওপর, ভিজে যায় বিছানা। এইভাবেই দিনের পর দিন, বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে একটি বৃদ্ধ দম্পতির জীবন। কোনো অভিযোগ নেই, নেই উচ্চস্বরে আহ্বান—শুধু নিঃশব্দ সহ্য।
এই দম্পতির করুণ গল্পের কেন্দ্রবিন্দু মো. রমজান আলী। জীবনের বড় একটি সময় তিনি কাটিয়েছেন দেশের সেবায়—একসময় ছিলেন আনসার বাহিনীর সদস্য। কর্মজীবন শেষ হলেও জীবনের লড়াই থেমে থাকেনি। শেষ বয়সে এসে তার নামে নেই এক চিলতে ভিটেমাটি, নেই মাথা গোঁজার নিরাপদ ছাদ। পাশে বসে থাকা স্ত্রী সাহিদা বেগমও নীরবে সঙ্গ দিচ্ছেন এই দীর্ঘ কষ্টের যাত্রায়। দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের ছিট আলোকডিহি এলাকায় তাদের বাস।
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর নিয়েও রমজান আলী প্রতিদিন কাজে বের হন। হাতে কোদাল, সামনে গোয়ালঘর—গরু, মুরগি আর খামারের নিত্য কাজই এখন তার জীবন। এই কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে মাস শেষে জোটে মাত্র এক হাজার টাকা। এই সামান্য আয় দিয়ে ওষুধ কেনা তো দূরের কথা, দু’বেলা ঠিকমতো খাওয়াই হয়ে ওঠে অনিশ্চিত।
বড় ছেলে শাহাজাহান আলী উপজেলার পাকেরহাট বাজারের ফুটপাতে বাদাম বিক্রি করেন। সারাদিন রোদে-পুড়ে, ধুলো মেখে কাজ করে যা আয় হয়, খরচ বাদে হাতে থাকে তিন-চারশ টাকা। এই সামান্য আয়েই ছয় সদস্যের সংসার চালাতে হয়। তাই বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিতে পারছেন না—এই অসহায়ত্ব তার চোখেও জমে থাকে প্রতিদিন।
রমজান আলী কোনো দান চান না, চান না বিশেষ সুযোগ। তিনি শুধু চান শেষ বয়সে একটু নিশ্চিন্ত ঘুম। কাঁপা কণ্ঠে বলেন,
“১৬ বছর ধরে এই খামারে আছি। বৃষ্টি হলে পানি পড়ে, শীতে শরীর কাঁপে। আর কিছু চাই না—শুধু ঘুমানোর মতো একটা ছাদ চাই।”
পাশে বসে থাকা সাহিদা বেগমের চোখ ভিজে ওঠে। ধীরস্বরে তিনি বলেন, “আমাদের নিজের কিছু নেই। মানুষের জায়গায় থাকি। কেউ খোঁজ নেয় না। এই শেষ বয়সে একটু ভালোভাবে বাঁচতে চাই।”
খামারের বর্তমান মালিক তাহেরা আজিজ মানবিকতার জায়গা থেকে তাদের আশ্রয় দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই দম্পতির মতো মানুষ সমাজে থাকার কথা নয়—তাদের থাকার কথা নিরাপদ ঘরে, রাষ্ট্রীয় সুরক্ষায়। একজন সাবেক আনসার সদস্যের এমন জীবন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ব্যর্থতার কথাই মনে করিয়ে দেয়।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অবিলম্বে এই পরিবারকে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা হোক। কারণ একটি ঘর শুধু ইট-পাথরের দেয়াল নয়—এটি মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা আর শান্তির প্রতীক।
এই ভাঙা ঘরের ভেতর প্রতিদিন জমে থাকে দীর্ঘশ্বাস। প্রশ্ন জাগে—যে মানুষটি একদিন রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় কাজ করেছেন, তার শেষ জীবনের নিরাপত্তা কি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়?


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









