রমজান মাস এলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতি যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। ইফতার সামগ্রীও এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু এমন বাস্তবতায় নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরে দেখা মিলেছে এক ভিন্ন ও মানবিক চিত্র। এখানে কয়েকজন হোটেল ব্যবসায়ী রমজান উপলক্ষ্যে ইফতার সামগ্রী বিক্রি করছেন অর্ধেক দামে, কোথাও আবার তার চেয়েও কম মূল্যে। তাঁদের এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
সরেজমিনে সৈয়দপুর শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নতুন বাবুপাড়া কলিম মোড়, হানিফ মোড়, সৈয়দপুর প্রেসক্লাব এলাকা, বাঁশাবাড়ি ও গোলাহাট কবরস্থান গেট সংলগ্ন কয়েকটি হোটেলে রমজান মাস উপলক্ষ্যে ইফতারির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাধারণ দিনে যে পিয়াজু, আলুর চপ, বেগুনী, পাপড় ধুনিয়া পাতার চপ প্রতিটি ৫ টাকা করে বিক্রি হয়, রমজানে সেগুলো বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২ থেকে ৩ টাকায়। শুধু তাই নয়, মাত্র ২০ টাকায় মিলছে ভাত, ডিম অথবা মাছসহ পরিপূর্ণ সেহরির ব্যবস্থা। আবার ৩০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে মুরগির বিরিয়ানী। এছাড়া পাওয়া যাচ্ছে ডিমচপ ৫ টাকা, নিমকপারা, বুন্দিয়া, জিলাপি, ছোলা, মালপোয়া, ছানা পোলাও মাত্র ১৪০ টাকা কেজি। এছাড়া মাত্র ১ টাকায় মিলছে ভাজা কাচা মরিচ। এতে করে বিশেষভাবে উপকৃত হচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত রোজাদার পরিবারগুলো।
নতুন বাবুপাড়া কলিম মোড়ের বাবু হোটেলে গিয়ে দেখা যায়, হোটেল মালিক বাবু (৪৩) তিনজন কর্মচারী নিয়ে ইফতার সামগ্রী প্রস্তুতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তিনি বলেন, রমজান মাসে এলাকার গরিব রোজাদাররা যেন নির্বিঘ্নে ইফতার করতে পারে, সেই চিন্তা থেকেই ৫ টাকার আইটেম ২ টাকায় বিক্রি করছি। এতে লাভ কম হচ্ছে, তবে লোকসান হচ্ছে না। আলহামদুলিল্লাহ, গরিব মানুষের দোয়া পাচ্ছি এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এছাড়া এখানে ২০ টাকায় ২ প্লেট ভাতের সাথে ডিম অথচা মাছ অথবা একপি মাংস দিয়ে পাওয়া যাচ্ছে সেহরীও। লোকসান প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ব্যবসায় লাভের হিসাব তো সারা বছরই করা যায়। কিন্তু এই এক মাস সেবার মানসিকতা নিয়ে কাজ করছি।
একই ধরনের মানবিক উদ্যোগ নিয়েছেন হানিফ মোড়ের শেখ জামিল হোটেলের মালিক জামিল চাচা (৬২)। এখানেও অন্যান্য দিন যে সব পন্য ৫ টাকায় বিক্রি হত রমজান উপলক্ষ্যে সেগুলো মাত্র ২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে তিনি জানান, ১১ মাস ব্যবসা করি নিজের জন্য। আর এই এক মাস আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। এই মাসে লাভের চিন্তা করি না। বিশ্বাস করি, আল্লাহ অন্যভাবে পূরণ করে দেবেন। এখানে আবার মাত্র ৩০ টাকায় ৪ পিস ব্রয়লার মুরগীর মাংস দিয়ে পাওয়া যাচ্ছে সুস্বাধূ বিরিয়ানি।
সৈয়দপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনে অবস্থিত মো. সিরাজ হোটেলের মালিক সিরাজ (৫৫) জানান, রমজানে তিনি আলুচপ ও বেগুনির দাম ৫ টাকা থেকে কমিয়ে ৩ টাকায় বিক্রি করছেন, যাতে সাধারণ মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে ইফতার কিনতে পারে।
গোলাহাট কবরস্থান গেট সংলগ্ন সামির হোটেলে গিয়ে দেখা যায়, তরুণ সামির (২৫) বাবা জাভেদ (৫২) ও ছোট মেয়ে মিরাকে নিয়ে ইফতার তৈরিতে ব্যস্ত। সামির বলেন, এই এলাকায় গরিব মানুষের সংখ্যা বেশি। তাই রমজানে ৫ টাকার জিনিস ৩ টাকায় বিক্রি করছি, যাতে ২০ টাকায় প্লেট ভরা ইফতার হয়। প্রতি বছরই রমজানে দাম কমাই। এটা আমাদের সেবার অংশ। এদিকে কম দামে ইফতার পেয়ে খুশি ক্রেতারাও। বাবু হোটেলে ইফতার কিনতে আসা সেতারা বেগম (৫৭) বলেন, এত কম দামে বাড়ির পাশে ইফতার পাচ্ছি এটা আমাদের জন্য অনেক বড় উপকার।
দিনমজুর মো. রিজওয়ান বলেন, আসলে এগুলো গরিবের হোটেল। কম দামে না পেলে আমাদের মতো মানুষের ইফতার জোগাড় করা কষ্টকর হতো। স্থানীয় বাসিন্দা বাবু মিয়া বলেন, খুব কম দানে ইফতার পাচ্ছি এখানে। তাই প্রতিদিনি আমরা এখান থেকেই কিনি। রমজানে নামমাত্র লাভে ইফতার বিক্রি করছে ওরা।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক ফারাহ ফতেমা তাকমিলা বলেন, রমজানে সাধারণত পণ্যের দাম বাড়ে এটাই আমাদের দেশের বাস্তব চিত্র। কিন্তু সৈয়দপুরের কয়েকজন ব্যবসায়ী যে মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে রমজানে পণ্যের দাম কমানো হয়। এখানেও এমন উদ্যোগ অনুসরণযোগ্য।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে সৈয়দপুরের কয়েকজন হোটেল ব্যবসায়ীর এমন উদ্যোগ রমজানের প্রকৃত শিক্ষা, সহমর্মিতা, ত্যাগ ও মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









