শীতকালীন ফসলের আবাদ ঘিরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে সারের চাহিদা বাড়লেও সেই অনুপাতে সরবরাহ নিশ্চিত হচ্ছে না। সময়মতো প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। ডিলারদের বিক্রয়কেন্দ্রে দীর্ঘ অপেক্ষা, হট্টগোল এমনকি হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি দামে সার না মিললেও খুচরা বাজারে বাড়তি টাকা দিলে পাওয়া যাচ্ছে।
গত মঙ্গলবার দুপুরে শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের বন্ধন ট্রেডার্স নামের একটি সার বিক্রয়কেন্দ্রে কৃষকদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন ডিলার পয়েন্টে কৃষকদের ভিড় ও বিশৃঙ্খলা সামাল দিতে পুলিশ ও প্রশাসনের সদস্যদেরও হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে।
কৃষক, সার ব্যবসায়ী ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে সংকটের পেছনে কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে চাহিদার তুলনায় বরাদ্দের ঘাটতি, মাঠপর্যায়ে সারের প্রকৃত প্রয়োজন নিরূপণে দুর্বলতা, বিতরণ ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা এবং কৃষকদের একাংশের আগাম সার সংগ্রহের প্রবণতা। কৃষিজমিতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে সার সংকটের অস্তিত্ব নিয়ে কৃষি বিভাগের বক্তব্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কৃষক ও ডিলারদের অভিজ্ঞতার রয়েছে ভিন্নতা।
কৃষকেরা বলছেন, শীতকালীন সবজি, পেঁয়াজ, সরিষা ও ভুট্টার আবাদ সামনে রেখে এখন সার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এ সময়ে একাধিক বিক্রয়কেন্দ্রে ঘুরেও চাহিদামতো সার পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে ডিলারদের দাবি, নভেম্বর মাসে আলু, পেঁয়াজ ও শীতকালীন সবজির আবাদ শুরু হলে সারের চাহিদা আরও বাড়বে। আগাম প্রস্তুতি হিসেবে কৃষকেরা প্রয়োজনের আগেই সার সংগ্রহ করায় বর্তমান পরিস্থিতিতে চাপ বেড়েছে।
চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি—এই চার ধরনের সারের মোট চাহিদা ১ লাখ ১৪ হাজার ৮৭৩ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৩৩৬ মেট্রিক টন। ফলে চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ ঘাটতি রয়েছে ১৩ হাজার ৫৩৭ মেট্রিক টন।
সার সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ৩৮ জন এবং বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ৫৮ জন ডিলার যুক্ত রয়েছেন।
ডিলার ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিএপি সারের প্রতি কৃষকদের চাহিদা তুলনামূলক বেশি। তাঁদের ভাষ্য, এক বস্তা ইউরিয়া ও এক বস্তা টিএসপি সারের দাম পৃথকভাবে ১ হাজার ৩৫০ টাকা। একই দামে ডিএপি সার পাওয়ায় এবং ব্যবহারে সুবিধার কথা বিবেচনা করে অনেক কৃষক ডিএপি সারের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে এ সারের চাহিদা বাড়ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের বিসিআইসির একজন ডিলার বলেন, তাঁর ইউনিয়নে চলতি মৌসুমে অন্তত ১০০ মেট্রিক টন ডিএপি সার প্রয়োজন। অথচ অক্টোবর ও নভেম্বর—দুই মাস মিলিয়ে বরাদ্দ পেয়েছেন প্রায় ৬৫ মেট্রিক টন। এ পরিমাণ সার দিয়ে সব কৃষকের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। গত বছর শুধু নভেম্বর মাসেই তাঁর বরাদ্দ ছিল ৬০ মেট্রিক টন।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) জেলা শাখার সভাপতি আকবর হোসেন বলেন, বরাদ্দ কম থাকায় কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সার সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বর্তমান বরাদ্দ দিয়ে সবার চাহিদা পূরণ করা কঠিন। প্রকৃত চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রায় শতাধিক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রয়েছেন। তাঁরা মাঠপর্যায়ে প্রকৃত কৃষকের তালিকা তৈরি এবং ফসলভিত্তিক সারের প্রয়োজন সঠিকভাবে নিরূপণ করতে পারলে এ ধরনের সমস্যা অনেকটাই কমে আসত। এ ছাড়া কৃষকদের একাংশ প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সার কিনে রাখছেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এলাকাভেদে ফসলের ধরন, বরাদ্দে সমন্বয়ের প্রশ্ন
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৪৫টি ইউনিয়নে একই ধরনের ফসল উৎপাদিত হয় না। কোনো এলাকায় আমসহ বিভিন্ন ফলের চাষ বেশি, আবার কোথাও মৌসুমি ফসলের আবাদ গুরুত্বপূর্ণ। আম, পেয়ারা, মাল্টাসহ বিভিন্ন ফল ও ফসলের আবাদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সারের প্রয়োজনীয়তাও পরিবর্তিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এলাকার ফসলের ধরন, চাষের পরিমাণ ও মৌসুমভিত্তিক চাহিদা যথাযথভাবে বিবেচনায় না নিয়ে সার বরাদ্দ ও বণ্টন করা হলে কোথাও ঘাটতি, আবার কোথাও উদ্বৃত্ত তৈরি হতে পারে। তাই মাঠপর্যায়ে প্রকৃত কৃষকের তালিকা ও ফসলভিত্তিক সারের চাহিদা নিরূপণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
খুচরা বাজারে বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ
কৃষক বাসার আলী অভিযোগ করে বলেন, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। ফলে সরকারি দামে সার কেনার সুযোগ না পেয়ে কৃষকদের বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ডিলার পয়েন্টে প্রয়োজনীয় সার পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ খুচরা দোকানে বাড়তি টাকা দিলে সার মিলছে। এতে সাধারণ কৃষকেরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
সংকট নেই বলছে কৃষি বিভাগ
এ বিষয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নয়ন মিয়া বলেন, ‘উপজেলায় সারের কোনো সংকট নেই। সিন্ডিকেটও নেই। চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি জানান, শুধু নভেম্বর মাসের জন্য উপজেলায় ১ হাজার ২৭৭ মেট্রিক টন ডিএপি, ৫০ মেট্রিক টন এমএপি, ২০৪ মেট্রিক টন টিএসপি এবং ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সারের অনিয়ম বন্ধে চলমান অভিযানে তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
অন্যদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ পাওয়া গেছে। কৃষকেরা বর্তমান আবাদে ব্যবহারের পাশাপাশি পরবর্তী ফসলের জন্যও আগাম সার সংগ্রহ করছেন। সার পাওয়া যাবে না—এমন আশঙ্কা থেকে তাঁদের মধ্যে তাড়াহুড়া তৈরি হয়েছে, যা বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে বিশৃঙ্খলার কারণ হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ডিলারদের দাবি অনুযায়ী পরিস্থিতিকে কোনো সিন্ডিকেটের কারসাজি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সংশ্লিষ্ট সচেতন মহলের মতে, ফসলভিত্তিক ও এলাকাভিত্তিক সারের প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ, ডিলারদের বরাদ্দের স্বচ্ছ হিসাব এবং সরকারি নির্ধারিত দামে সার বিক্রি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি প্রকৃত কৃষকের তালিকা হালনাগাদ করে সেই অনুযায়ী সার বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে। এসব উদ্যোগ কার্যকর না হলে বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও কৃষকের কাছে সময়মতো সার পৌঁছানো কঠিন হবে। আর আবাদ মৌসুমে সারের অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব পড়তে পারে উৎপাদন ব্যয় ও কৃষকের ফসল উৎপাদনের পরিকল্পনায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









