নতুন সরকার গঠনের পর দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জেলা বরিশালে মানুষের প্রত্যাশা এখন তুঙ্গে। দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বৈষম্য, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা, শিল্পায়নের অভাব ও কর্মসংস্থানের সংকট কাটিয়ে একটি আধুনিক, সংযুক্ত ও সমৃদ্ধ বরিশাল গড়ার দাবি তুলেছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণ এবং রেল যোগাযোগ চালু এখন বরিশাল-ভোলা অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবি হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে ভোলা জেলা ও বরিশাল-এর মধ্যে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম নদীপথ। প্রতিদিন হাজারো মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চ ও স্পিডবোটে যাতায়াত করেন। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়ে, স্থবির হয়ে যায় ব্যবসা-বাণিজ্য।
ভোলার চরফ্যাশনের বাসিন্দা স্কুলশিক্ষক আবদুল করিম বলেন, একটি সেতু শুধু যোগাযোগ সহজ করবে না, পুরো দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিকে বদলে দেবে। আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্যই এই সেতু দরকার।
বরিশালের ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, ভোলা-বরিশাল সেতু হলে কৃষিপণ্য, মাছ ও অন্যান্য পণ্য পরিবহন দ্রুত ও কম খরচে সম্ভব হবে। এতে দামও কমবে, ব্যবসাও বাড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, সেতু নির্মাণ হলে পর্যটন, শিল্প ও বিনিয়োগে নতুন গতি আসবে। বরিশাল বিভাগ একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।
দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র বিভাগীয় শহর হয়েও বরিশালে এখনো রেল সংযোগ না থাকা অনেকের কাছে বিস্ময়কর। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলেন, ঢাকায় যেতে ৬–৮ ঘণ্টা সময় লাগে। রেল থাকলে সময় ও খরচ দুটোই কমত। শিক্ষার্থী ও রোগীদের জন্য এটা খুব প্রয়োজন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুবুল আলম বলেন, রেল যোগাযোগ না থাকায় শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত রেললাইন স্থাপন করলে বরিশাল জাতীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারবে।
দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে পায়রা বন্দর। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোলা-বরিশাল সেতু ও রেল সংযোগ স্থাপিত হলে পায়রা বন্দরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে, যা রপ্তানি-বাণিজ্য ও শিল্পায়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
তরুণদের প্রধান দাবি-কর্মসংস্থান। আইটি পার্ক, কৃষিভিত্তিক শিল্প, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা প্রকল্প চালুর আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বেসরকারি চাকুরিজীবী মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রতিবছর হাজারো শিক্ষার্থী পাস করে বের হচ্ছে, কিন্তু চাকরির সুযোগ নেই। শিল্পকারখানা স্থাপন ছাড়া এই সংকট কাটবে না।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সেবার মান উন্নয়ন, বিশেষায়িত চিকিৎসা চালু এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের দাবি উঠেছে।
একই সঙ্গে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, স্বচ্ছ নিয়োগ, নিরাপদ সড়ক ও কার্যকর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন নাগরিকরা।
নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে ভাঙন রোধে টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার তাগিদ দিয়েছেন পরিবেশবিদরা।
বরিশালবাসীর প্রত্যাশা এখন সুস্পষ্ট-প্রতিশ্রুতির রাজনীতি নয়, দৃশ্যমান উন্নয়ন। ভোলা-বরিশাল সেতু ও রেল যোগাযোগ বাস্তবায়নকে তারা দক্ষিণাঞ্চলের ভাগ্যবদলের চাবিকাঠি হিসেবে দেখছেন।
নতুন সরকারের জন্য এটি শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; বরং দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের পরীক্ষা। এখন দেখার বিষয়-এই প্রত্যাশা কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









