নদীর বুকে সারি সারি পানসি নৌকা। নৌকাভর্তি সবুজ-হলুদ আমড়া। ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাক আর দরদামে মুখরিত চারপাশ। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে নদীর চরে বসে এমন ব্যতিক্রমী ভাসমান আমড়ার হাট। দূরদূরান্ত থেকে পাইকাররা আসেন আমড়া কিনতে। কয়েক ঘণ্টার বেচাকেনায় লেনদেন হয় কোটি টাকার। অথচ যে কৃষকের ঘাম আর শ্রমে ফলেছে এসব আমড়া, সেই কৃষকের মুখেই নেই প্রত্যাশিত হাসি। কারণ, ভালো ফলন হলেও ন্যায্যমূল্য, উৎপাদন ব্যয় ও সংরক্ষণের সংকটে লাভের মুখ দেখছেন না তাঁরা।
পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার আমড়ার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এখানকার সুস্বাদু ও মিষ্টি আমড়ার চাহিদা রয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ফেনী, রাজশাহী ও খুলনাসহ বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরে। আমড়াকে ঘিরে গড়ে উঠেছে কৃষি, শ্রম, পরিবহন ও ব্যবসার বিশাল কর্মযজ্ঞ। স্থানীয়দের দাবি, এ অঞ্চলের প্রায় ৬০ হাজার কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট মানুষের জীবিকার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে রয়েছে আমড়ার বাণিজ্য।
উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নেছারাবাদ উপজেলায় প্রায় ৩০০ হেক্টর জমিতে চার হাজারের মতো বাগানে আমড়ার আবাদ হয়েছে। চলতি মৌসুমে প্রতি হেক্টরে গড়ে ১৬ থেকে ১৭ মেট্রিক টন আমড়া উৎপাদিত হয়েছে। সে হিসাবে মোট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৪ হাজার ৮০০ থেকে ৫ হাজার ১০০ মেট্রিক টন। ফলন ভালো হলেও সংরক্ষণব্যবস্থার অভাবে কৃষকের কাঙ্ক্ষিত লাভ হচ্ছে না।
নদীর বুকে ব্যতিক্রমী ভাসমান হাট
নেছারাবাদ ও ঝালকাঠি উপজেলার নদী-সংলগ্ন আদমকাঠি, জিন্দাকাঠি, ভিমরুল, কুড়িয়ানা ও আটঘর এলাকায় আমড়ার উৎপাদন ও বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী ভাসমান বাজার। প্রতি সপ্তাহের শুক্র ও সোমবার আদমকাঠি ও ভিমরুল নদী-খালের চরে পানসি নৌকায় বসে এই হাট।
এখানে কৃষকেরা নৌকায় করে বাগানের আমড়া নিয়ে আসেন। পাইকাররা নৌকায় নৌকায় ঘুরে দরদাম করে আমড়া কেনেন। পরে সেসব আমড়া পৌঁছে যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। স্থানীয় চাষিদের দাবি, সপ্তাহে এসব হাটে প্রায় কোটি টাকার আমড়া বেচাকেনা হয়। এই ভাসমান বাজার শুধু কৃষিপণ্য কেনাবেচার স্থান নয়, বরং দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য পরিচয়।
ফলন ভালো, কিন্তু লাভের খাতায় ঘাটতি
আমড়াচাষি অমল বলেন, উৎপাদন খরচ যেভাবে বাড়ছে, সেভাবে বাড়ছে না আমড়ার দাম। জমির পরিচর্যা, সার, শ্রমিকের মজুরি, ফল সংগ্রহ ও পরিবহনসহ প্রতিটি পর্যায়ে খরচ বেড়েছে। অথচ ফল দ্রুত পেকে যাওয়ায় বেশি দিন ধরে রাখা যায় না। ফলে বাধ্য হয়ে কম দামে আমড়া বিক্রি করতে হয়।
আরেক আমড়াচাষি অমর বলেন, একসময় আমড়াচাষ করে কৃষকেরা বেশ ভালো ছিলেন। এখন উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো লাভ হচ্ছে না। দ্রুত একটি হিমাগারের ব্যবস্থা না হলে আমড়া ও পেয়ারা চাষিরা আর্থিক ও বাণিজ্যিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলে ভবিষ্যতে ঐতিহ্যবাহী এই চাষ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়বে।
চাষিদের অভিযোগ, চলতি মৌসুমে বৃষ্টিপাত কম ও অতিরিক্ত গরমের কারণে আমড়া দ্রুত পেকে যাচ্ছে। ফলে বাজারে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ আমড়া ওঠায় দাম কমে যাচ্ছে। পচনশীল এই ফল সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় অনেকটা বাধ্য হয়েই কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে তাঁদের।
পাইকারদেরও রয়েছে ঝুঁকি
আমড়ার বাজারে শুধু কৃষকরাই নন, পাইকার ও ব্যবসায়ীদেরও নানা ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। নোয়াখালীর আমড়া ব্যবসায়ী সেলিম সিকদার বলেন, আমড়া পচনশীল ফল হওয়ায় দ্রুত বিক্রি করতে হয়। চলতি মৌসুমে বৃষ্টিপাত কম হওয়া ও গরমের কারণে ফল দ্রুত পেকে যাওয়ায় তাঁদের ঝুঁকিও বেড়েছে। সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতা, পরিবহন ব্যয় এবং ফল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়েই তাঁরা আমড়া কেনেন।
আমড়ার আড়তদার সুভাষ কুমার সিকদার বলেন, কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বাজারদরের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য নেই। এভাবে চলতে থাকলে কৃষকেরা দীর্ঘমেয়াদে আমড়াচাষে আগ্রহ হারাবেন। একটি আধুনিক হিমাগার স্থাপন করা হলে প্রয়োজন অনুযায়ী আমড়া সংরক্ষণ করে ধাপে ধাপে বাজারজাত করা সম্ভব হবে। এতে একসঙ্গে অতিরিক্ত আমড়া বাজারে ওঠার চাপ কমবে এবং কৃষকেরা তাড়াহুড়ো করে কম দামে ফল বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না।
হিমাগার, প্রশিক্ষণ ও সহজ ঋণের দাবি
স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহলের দাবি, নেছারাবাদে আমড়া ও পেয়ারা সংরক্ষণের উপযোগী আধুনিক হিমাগার স্থাপন এখন সময়ের দাবি। তবে হিমাগার নির্মাণের আগে ফলের প্রকৃতি অনুযায়ী উপযুক্ত তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও সংরক্ষণপ্রযুক্তি কৃষি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। পাশাপাশি উৎপাদনের পরিমাণ, সংরক্ষণ ব্যয় এবং কৃষকদের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
নেছারাবাদ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, কৃষকেরা কৃষি কার্যালয়ে আবেদন করলে তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে সুপারিশ করা হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, নেছারাবাদের আমড়াচাষ ও ভাসমান হাট কেবল কৃষিপণ্যের বাণিজ্যকেন্দ্র নয়; এটি এ অঞ্চলের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এই সম্ভাবনাময় খাতকে টিকিয়ে রাখতে কৃষক, ব্যবসায়ী, কৃষি বিভাগ, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
নদীর বুকে পানসি নৌকায় কোটি টাকার আমড়ার বাণিজ্য, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নেছারাবাদের আমড়ার সুনাম সবই রয়েছে। এখন প্রয়োজন কৃষকের উৎপাদিত ফলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কৃষকদের দক্ষ করে তোলা। তা না হলে সম্ভাবনাময় এই কৃষি ঐতিহ্য একসময় সংকটে পড়তে পারে। কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে তাই এখন সবচেয়ে বড় দাবি নেছারাবাদে একটি আধুনিক হিমাগার।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









