ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিরোজপুর-২ (নেছারাবাদ, কাউখালী ও ভান্ডারিয়া) আসনে ৭ জন প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আহম্মদ সোহেল মনজুর সুমন ১ লাখ ৫ হাজার ১৮৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী শামীম সাঈদী পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৮৯৭ ভোট। দুই প্রার্থীর মধ্যে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান দাঁড়ায় ৮ হাজার ২৮৮ ভোট।
এই আসনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তিন উপজেলার ভোটের ভিন্ন ভিন্ন চিত্র থাকলেও নেছারাবাদ উপজেলার বিপুল ব্যবধানই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
উপজেলা ভিত্তিক ফল: নেছারাবাদে বড় ব্যবধানই টার্নিং পয়েন্ট; তিন উপজেলার মধ্যে নেছারাবাদ উপজেলায় ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আহম্মদ সোহেল মনজুর সুমন পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৫০০ ভোট, বিপরীতে শামীম সাঈদী পেয়েছেন ৩৭ হাজার ১৬৩ ভোট। অর্থাৎ শুধু এই উপজেলাতেই তিনি ৩২ হাজারের বেশি ভোটে এগিয়ে ছিলেন।
অন্যদিকে, কাউখালী উপজেলায় শামীম সাঈদী ১৮ হাজার ৯৯১ ভোট পেয়ে এগিয়ে থাকলেও আহম্মদ সোহেল মনজুর পান ১৫ হাজার ৩ ভোট। একইভাবে ভান্ডারিয়া উপজেলায়ও শামীম সাঈদী ৩৯ হাজার ১৯ ভোট পেয়ে এগিয়ে থাকেন, যেখানে আহম্মদ সোহেল মনজুর পান ১৯ হাজার ৯১০ ভোট। অর্থাৎ দুই উপজেলায় পিছিয়ে থেকেও নেছারাবাদের বিশাল ব্যবধানই সামগ্রিক ফলাফলে তাকে বিজয়ী করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পিরোজপুর-২ আসনের নির্বাচনে নেছারাবাদ উপজেলাকে দীর্ঘদিন ধরেই “ভোট ব্যাংক” হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ উপজেলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছেন, যাদের সমর্থন নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।
নির্বাচনে আহম্মদ সোহেল মনজুর তার প্রচারণায় নেছারাবাদের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক তুলে ধরেন। তিনি জনসভা ও উঠান বৈঠকে তার নানা বাড়ি নেছারাবাদে হওয়ায় এলাকার সঙ্গে আত্মিক সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন, যা স্থানীয় ভোটারদের কাছে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য বড় ফ্যাক্টর; আহম্মদ সোহেল মনজুর সুমন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক মন্ত্রী মরহুম নূরুল ইসলাম মনজুর-এর সন্তান। মুক্তিযুদ্ধকালীন নবম সেক্টরের বেসামরিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং পরবর্তীতে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে তার পিতার রাজনৈতিক ও সামাজিক অবদান এলাকাবাসীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। স্থানীয় ভোটারদের মতে, এই পারিবারিক ঐতিহ্য ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে জামায়াত প্রার্থী।
অন্যদিকে, জামায়াত প্রার্থী শামীম সাঈদী ছিলেন প্রয়াত আলেম ও সাবেক সংসদ সদস্য দেলোয়ার হোসেন সাঈদী-এর ছেলে। তার পিতার জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হলেও নেছারাবাদ উপজেলায় প্রত্যাশিত সমর্থন পাননি। যদিও কাউখালী ও ভান্ডারিয়ায় তিনি উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন, কিন্তু নেছারাবাদের ফলাফল তার সেই ব্যবধান পূরণ করতে পারেনি।
ভোটার উপস্থিতি ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার তিন উপজেলায় ভোটার উপস্থিতির হার ছিল উল্লেখযোগ্য- নেছারাবাদ: ৫৮.৫৮%, কাউখালী: ৫৭.৪৩%, ভান্ডারিয়া: ৫৫.৪৫%, এতে বোঝা যায়, ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিজয়ের পেছনে প্রধান কারণসমূহ বিশ্লেষণে আহম্মদ সোহেল মনজুর সুমনের বিজয়ের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করা যায়-
১. নেছারাবাদ উপজেলায় বিপুল ব্যবধান
এই উপজেলার ভোটই নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করেছে।
২. পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা; সাবেক মন্ত্রী নূরুল ইসলাম মনজুরের পুত্র হওয়ায় ভোটারদের আস্থা অর্জনে সহায়ক হয়েছে।
৩. স্থানীয় পরিচয় ও সংযোগের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া; প্রচারণায় এলাকার সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক তুলে ধরা ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
৪. ভোটের কৌশলগত বণ্টন; দুই উপজেলায় পিছিয়ে থেকেও একটি বড় উপজেলায় বিশাল ব্যবধান তৈরি করায় সামগ্রিকভাবে জয় নিশ্চিত হয়েছে।
পরিশেষে সামগ্রিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, পিরোজপুর-২ আসনের নির্বাচনে ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য, কৌশলগত ভোট ব্যবধান এবং বিশেষ করে নেছারাবাদ উপজেলার নির্ধারক ভোট- এই চারটি বিষয় আহম্মদ সোহেল মনজুর সুমনের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এই ফলাফল ভবিষ্যতেও পিরোজপুর-২ আসনের রাজনীতিতে নেছারাবাদ উপজেলার গুরুত্ব আরও বাড়াবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উল্লেখ্য, আহম্মদ সোহেল মনজুর সুমন পিরোজপুর-২ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে বর্তমানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









