কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশি, পাহাড়ের সবুজ আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের মাঝে নতুন করে সেজে উঠছে রাঙামাটির ফিশারি সংযোগ বাঁধ। একসময় দুই পাশে অথৈ জল আর মাঝখানে আঁকাবাঁকা সড়কের নান্দনিক দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করলেও দীর্ঘদিনের অবহেলা, ভাঙন ও পরিচর্যার অভাবে হারিয়ে গিয়েছিল স্থানটির পুরোনো সৌন্দর্য। সেই বিবর্ণ বাঁধেই এবার সবুজের নতুন কাব্য রচনা করছেন রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা।
তাঁর পরিকল্পনায় বাঁধের সম্প্রসারিত অংশে গড়ে তোলা হচ্ছে ফুলের বাগান, সবুজায়ন ও মনোরম বিনোদনকেন্দ্র। প্রকৌশল পরিকল্পনার সঙ্গে প্রকৃতিপ্রেমের মেলবন্ধনে ফিশারি বাঁধ ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে নান্দনিক এক লেকভিউ গার্ডেনে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ককে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি সেটিকে মানুষের অবসর, বিনোদন ও প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের জায়গায় পরিণত করার এ উদ্যোগ ইতোমধ্যে স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। সবুজের ফাঁকে লাল, হলুদ ও গোলাপি ফুলের সমারোহ, দুই পাশে কাপ্তাই হ্রদের জলরাশি—সব মিলিয়ে ফিশারি বাঁধের নতুন রূপ রাঙামাটির পর্যটন সৌন্দর্যে যোগ করতে যাচ্ছে নতুন মাত্রা।

হারিয়ে যাওয়া সৌন্দর্য ফেরানোর উদ্যোগ
একসময় রাঙামাটি শহরের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান ছিল ফিশারি সংযোগ সড়ক। সড়কের দুই পাশে সারি সারি কৃষ্ণচূড়া গাছে ফুটে থাকা আগুনরাঙা ফুল প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করত। হ্রদের বুক চিরে চলে যাওয়া এ পথের দুই পাশের জলরাশি আর কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুলে তৈরি হতো অপরূপ দৃশ্য। সড়কে প্রবেশ করলেই চোখ জুড়িয়ে যেত স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের।
কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই সৌন্দর্যে নেমে আসে বিবর্ণতা। কৃষ্ণচূড়া গাছ সরিয়ে করই গাছ রোপণ, দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাব এবং কাপ্তাই হ্রদের ঢেউ ও ভাঙনে বাঁধের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে সড়কটির নান্দনিকতা।
শুধু সৌন্দর্যহানিই নয়, বাঁধের অস্তিত্ব নিয়েও দেখা দেয় উদ্বেগ। হ্রদের ঢেউ ও ভাঙনে বাঁধের মাটি ক্ষয়ে পানিতে মিশতে থাকে। একপর্যায়ে ভাঙন সড়কের তীরবর্তী অংশে পৌঁছালে যেকোনো সময় সড়কটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। বাঁধ রক্ষার দাবিতে বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন, মিছিল ও সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও দীর্ঘদিন স্থায়ী সমাধান পাওয়া যায়নি।
ভাঙন রোধে ২৮৬ কোটি টাকার প্রকল্প
২০১৭ সালের ১৩ জুন রাঙামাটিতে ভয়াবহ পাহাড়ধসে জেলার সড়ক যোগাযোগব্যবস্থায় ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। এতে জেলার সড়কের ১৫১টি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সড়ক যোগাযোগ পুনরুদ্ধার, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো সংস্কার এবং পাহাড় ও ভূমিধসের ঝুঁকি কমাতে সড়ক ও জনপথ বিভাগ ২৮৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করে।
রাঙামাটি সড়ক বিভাগের অধীন পাহাড় ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের বিভিন্ন কিলোমিটারে ড্রেনসহ স্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক আরসিসি রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ফিশারি সংযোগ বাঁধের সংস্কার, উন্নয়ন ও সুরক্ষার কাজ হাতে নেওয়া হয়।
২০১৯ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের আওতায় ৬৬৩ মিটার দৈর্ঘ্যের ফিশারি সংযোগ বাঁধের এক পাশে নির্মাণ করা হয় আরসিসি রিটেইনিং ওয়াল বা প্রতিরক্ষা দেয়াল। পাশাপাশি মাটি ভরাট করে বাঁধের সম্প্রসারণ করা হয়।
এ অবকাঠামোগত উন্নয়ন বাঁধটির সুরক্ষার পাশাপাশি নতুন করে সৌন্দর্যবর্ধনের সুযোগ তৈরি করে। সম্প্রসারিত জায়গাটিকে অব্যবহৃত না রেখে সেখানে সবুজায়ন, ফুলের বাগান ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা থেকেই শুরু হয় নতুন উদ্যোগ।
সবুজ চাকমার পরিকল্পনায় নতুন রূপ
ফিশারি বাঁধের সৌন্দর্যবর্ধনের এ উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা। প্রকৌশলগত দায়িত্বের পাশাপাশি প্রকৃতির সৌন্দর্যকে নতুনভাবে উপস্থাপনের ভাবনা তাঁর পরিকল্পনায় যুক্ত করেছে ভিন্ন মাত্রা।
বাঁধের সম্প্রসারিত অংশে মাটি ভরাটের পর সেটিকে কেবল অব্যবহৃত জায়গা হিসেবে ফেলে না রেখে সেখানে সবুজায়ন, ফুলের বাগান ও বিনোদনকেন্দ্র তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সবুজের সঙ্গে লাল, হলুদ ও গোলাপি ফুলের রঙিন সমারোহে সাজিয়ে তোলা হচ্ছে বাঁধের বিভিন্ন অংশ।
এ উদ্যোগের ফলে ফিশারি বাঁধের পরিচিত দৃশ্যপটে যুক্ত হচ্ছে নতুন সৌন্দর্য। একদিকে সড়ক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, অন্যদিকে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের মেলবন্ধনের সম্ভাবনাময় স্থান—দুইয়ের সমন্বয়ে তৈরি হচ্ছে ভিন্নধর্মী পরিবেশ।
প্রচারবিমুখ নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা নিজের পরিকল্পনা নিয়ে এখনই বিস্তারিত বলতে চান না। তাঁর ভাষায়, ‘আগে কাজটা তো হোক, তারপর এ নিয়ে একসময় বিস্তারিত বলা যাবে।’
তবে তাঁর এই উদ্যোগের দৃশ্যমান পরিবর্তন ইতোমধ্যে নজর কেড়েছে স্থানীয়দের। বাঁধের সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে মানুষের আগ্রহ। অনেকের কাছে এটি শুধু একটি সড়কের সৌন্দর্যবর্ধন নয়; বরং দীর্ঘদিনের অবহেলায় হারিয়ে যাওয়া একটি প্রিয় স্থানের নতুন করে ফিরে আসার গল্প।
উল্লেখ্য, পরিবেশ ও প্রকৃতি সুরক্ষায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সবুজ চাকমা ‘ব্র্যাক ব্যাংক-তরুপল্লব দ্বিজেন শর্মা পরিবেশ পদক ২০২৪’ ও ‘বৃক্ষসখা সম্মাননা’ পেয়েছেন।

৮৮ লাখ টাকায় চলছে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ
সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির আওতায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) খাত থেকে বরাদ্দ পাওয়া ৮৮ লাখ টাকা দিয়ে বর্তমানে সৌন্দর্যবর্ধন ও বিনোদনকেন্দ্র তৈরির কাজ চলছে।
এ উদ্যোগের মাধ্যমে ফিশারি বাঁধের সম্প্রসারিত অংশকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। কাপ্তাই হ্রদের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের জন্য একটি মনোরম পরিবেশ তৈরি হবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ কৃত্রিম জলরাশি কাপ্তাই হ্রদ রাঙামাটির পর্যটন আকর্ষণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। হ্রদের তীরবর্তী ফিশারি বাঁধের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানকে পরিকল্পিতভাবে সাজিয়ে তোলা গেলে তা শহরের পর্যটন সম্ভাবনাকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।
এর আগে বিভিন্ন সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ, রাঙামাটি পৌরসভা ও পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধটি রক্ষা এবং সৌন্দর্যবর্ধনে বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও দীর্ঘস্থায়ীভাবে এর সামগ্রিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান উদ্যোগে প্রতিরক্ষা ও সম্প্রসারণের পাশাপাশি সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে।
পর্যটনে নতুন আকর্ষণের অপেক্ষা
রাঙামাটি শহরের রিজার্ভবাজার, তবলছড়ি ও বনরূপার মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে ফিশারি বাঁধের গুরুত্ব অপরিসীম। শহরের গুরুত্বপূর্ণ এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ যাতায়াত করেন। একই সঙ্গে কাপ্তাই হ্রদের দুই পাশের অপরূপ দৃশ্যের কারণে স্থানটি দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় দর্শনার্থী ও পর্যটকদের কাছে পরিচিত।
সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ সম্পন্ন হলে ফিশারি বাঁধ শুধু যাতায়াতের পথ হিসেবেই নয়, শহরের একটি আকর্ষণীয় বিনোদনকেন্দ্র হিসেবেও পরিচিতি পেতে পারে। বিশেষ করে বিকেল ও সন্ধ্যায় প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ, অবসর কাটানো এবং ছবি তোলার জন্য স্থানটি নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রকৃতির সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ রেখে পরিকল্পিতভাবে সবুজায়ন ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে রাঙামাটির পর্যটন খাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জন্য শহরের ভেতরেই প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানোর একটি মনোরম জায়গা তৈরি হবে।
ফিশারি বাঁধের এই পরিবর্তন যেন রাঙামাটির প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্কের নতুন গল্প। যে বাঁধ একসময় ভাঙনের আশঙ্কায় ছিল, সেই বাঁধই এখন সবুজের সাজে নতুন পরিচয় পাওয়ার অপেক্ষায়। কাপ্তাই হ্রদের নীল জল, পাহাড়ের সবুজ আর ফুলের রঙিন সমারোহে সবুজ চাকমার পরিকল্পনা পূর্ণতা পেলে ফিশারি বাঁধ হয়ে উঠতে পারে রাঙামাটির সৌন্দর্যের নতুন প্রতীক।
এখন অপেক্ষা সেই স্বপ্নের পূর্ণ বাস্তবায়নের। সবুজের ছোঁয়ায় ফিশারি বাঁধের এই নতুন অধ্যায় কতটা পূর্ণতা পায়, তা সময়ই বলে দেবে। তবে প্রকৌশল পরিকল্পনার সঙ্গে প্রকৃতিপ্রেমের যে মেলবন্ধন ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে, তা রাঙামাটির সৌন্দর্যবর্ধনে একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









