সুনামগঞ্জে হাওর রক্ষা বাঁধ মানেই আলাদিনের চেরাগ। কোনো প্রকার বিনিয়োগ ছাড়াই চলে এসব প্রকল্পের কাজ। কোটি কোটি টাকার এসব প্রকল্প নিয়ে প্রতি বছরই চলে নানা নাটকিয়তা। কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সুশীল সমাজ থেকে শুরু করে সবাই যুক্ত থাকেন পিআইসি সিন্ডিকেটে। আর এই কমিটি গঠনে বানিজ্য চলে উপজেলা থেকে জেলা পর্যায়ে। সরকারি নীতিমালায় উল্লেখ থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রকল্পের আওতার বাহিরে থেকে বঞ্চিত হন প্রকৃত কৃষকরা । এসব পিআইসি কমিটির সদস্যদের দুর্নীতি, অনিয়ম ও কর্মকর্তাদের ঘুষ বাণিজ্যের জন্য হাওরের ফসল থাকে হুমকির মুখে। পিআইসির সময় আসলেই নীতিমালার দোয়াই দিয়ে গনশুনানীর নামে চলে লোক দেখানো ভাওতাবাজি। আর এসবের কারনেই নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিলেও কাজ শেষ করতে পারেনি পিআইসির সদস্যরা। প্রত্যেক বছরেই চলে এসব কর্মকান্ড। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় নির্ধারিত সময়ে এবছর (২৫-২৬ অর্থবছরে) সবচেয়ে বেশি কম পরিমান কাজ হয়েছে। কিন্তু কাগজে কলমে রয়েছে ভিন্নরুপ তবে মাঠ পর্যায়ের কাজের গতির চেয়ে কলমের গতি বেশি।
নির্ধারিত সময়সীমা ২৮ ফেব্রুয়ারি কাজ শেষ করার কথা। তবে এখনো পর্যন্ত অনেক বাঁধে কাজ শুরুই হয়নি। অথচ পাউবোর তথ্য অনুযায়ী হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ ৭৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের কৃষক ও সুনামগঞ্জ হাওর আন্দলোনের নেতাদের দাবী সারা জেলায় অর্ধেকের চেয়ে বেশি কাজ বাকি রয়েছে।
পাউবোর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর জেলায় প্রায় ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭০২টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাউবোর দাবি অনুযায়ী, মাটির কাজ ৭৫ শতাংশ এবং ১১০টি ক্লোজারের কাজ ৮৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। তবে এই পরিসংখ্যানকে ‘জালিয়াতি’ ও ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা। তাদের অভিযোগ, দিরাই, শাল্লা, তাহিরপুর, জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জের অনেক প্রকল্পে এখনো মাটি ফেলার কাজই শুরু হয়নি।
অভিযোগ উঠেছে, পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) গঠনে নীতিমালা উপেক্ষা করে গণশুনানি ছাড়াই পছন্দের লোকদের কাজ দেওয়া হয়েছে। অনেক অক্ষত ও অপ্রয়োজনীয় বাঁধে বিপুল বরাদ্দ দিয়ে সরকারি টাকা ‘হরিলুটের’ আয়োজন করা হয়েছে বলে দাবি করেছে সুনামগঞ্জ হাওর বাঁচাও আন্দোলনসহ বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, "জেলা প্রশাসন ও পাউবোর মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। বাঁধের কাজে মনোযোগ না দিয়ে সংশ্লিষ্ট অনেকেই ঘুষ লেনদেনে ব্যস্ত। ফলে কাজের মান অত্যন্ত নিম্নমুখী এবং ধীরগতি দেখা দিচ্ছে।"
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জ-১ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল তার নির্বাচনী এলাকার অন্তত ২০টি বাঁধ পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাঁধের কাজে কোনো 'কম্পেকশন' করা হচ্ছে না এবং ক্লোজারের কাজগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দ্রুত কাজ শেষ না হলে আগাম বন্যায় হাওরের ফসলহানির চরম আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, শাল্লা উপজেলা কৃষকদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক একরামুল হোসেন অভিযোগ করেন, জেলা প্রশাসক পিআইসি গঠনে চরম পক্ষপাতিত্ব করেছেন। প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে কমিটি গঠন করা হয়েছে। শাল্লা উপজেলায় এখনো ৪টি পিআইসির কাজ শুরু হয়নি বলে তিনি জানান।
কাজের ধীরগতির কথা স্বীকার করে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী ও কাবিটা মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব মামুন হাওলাদার বলেন, "২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই গতকাল ২৫ ফেব্রুয়ারি আমরা সময় বৃদ্ধির জন্য আবেদন করেছি।"
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে জেলা প্রশাসক ও কাবিটা কমিটির সভাপতি ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়ার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
হাওরবাসীর অভিযোগ, প্রতিবছরই বাঁধের নামে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও সঠিক সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় কৃষকদের আতঙ্কে থাকতে হয়। এবারও দুর্নীতির কারণে বাঁধ নির্মাণে বিলম্ব হওয়ায় কয়েক লাখ হেক্টর জমির বোরো ফসল এখন প্রকৃতির দয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









