“সূর্য ডুবে সন্ধ্যা নামতেই মশার আক্রমণ শুরু। এতই অত্যাচার যে মশার কামড়ে হাত-পা চুলকানি শুরু হয়। কয়েল জ্বালিয়ে রাখলেও মশার অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়া যাচ্ছে না। মশাগুলো এতই শক্তিশালী যে একপাশ দিয়ে তাড়ালে অন্য পাশ থেকে কামড়াতে আসে। সন্ধ্যা থেকে রাত্রি ১০ টা পর্যন্ত কয়েকশো মশা কামড়িয়েছে।”- হাতে থাকা পাখা দিয়ে মশা তাড়াতে তাড়াতে কথাগুলো বলছিলেন নগরীর আমচত্বর এলাকার ভ্রাম্যমাণ পেয়ারা ব্যবসায়ী আলতাফ হোসেন।
শুধু আলতাফ হোসেন নয়, রাজশাহী মহানগরীর প্রতিটি অলি-গলিতে মশার বিস্তার বেড়েছে কয়েকগুণ। সন্ধ্যা নামতেই আবাসিক এলাকায় শুরু হয় মশার উৎপাত। মশার আক্রমণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন নগরবাসী। কয়েল, স্প্রে কিংবা অন্য কোনো উপায় যেন স্বস্তি মিলছে না। মশার সমস্যায় ভোগান্তি পোহালেও কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান না পাওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে বাসিন্দাদের মধ্যে।
এদিকে নগরবাসীকে মশার উৎপাত থেকে রক্ষায় নগর কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ নগরের বাসিন্দাদের। তারা জানান মশার কাছেই আত্নসর্মপণ করেছে কর্তৃপক্ষ। নগরীর নওদাপাড়া এলাকার বাসিন্দা সম্রাট হোসেন বলেন,“মশার অত্যাচারে টিকে থাকায় দায়। রোয়ার দিন এখন, ইফতারের সময় মশার কামড়ে বসা যায় না। কয়েল জ্বালিয়ে রাখলেও কাজ হয় না। সিটি কপোরেশন থেকে অনেক দিন আগে ধোঁয়া ও মশার ওষুধ ছিটিয়ে গিয়েছিলো কিন্ত কোন কাজ হয়নি। তারা যদি নিয়মিত মশা মারা অভিযান নিতো তাহলে ভালো হতো। আমরা মশার অত্যচার থেকে মুক্তি পেতাম।”
বসুয়া এলাকার বাসিন্দা তোহিদুল ইসলাম বলেন,“সিটি কর্পোরেশন থেকে আমাদের এইদিকে মাঝেমধ্যে মশা নিধনে ফগার মেশিন ব্যবহার করতে দেখি। তারা যদি নিয়মিত মশা মারা ওষুধ প্রয়োগ করতো এবং রাস্তার পাশের ড্রেন গুলো পরিস্কার করতো তাহলে এতো মশার অত্যাচার হতো না। আসলে এখন মনে হচ্ছে মশার কাছেই সবাই আত্নসমর্পণ করেছে।”
মহানগরীর বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নগরজুড়ে ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজ চলমান থাকায় আশেপাশের ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিস্কার করা হয়নি দীর্ঘদিন। এছাড়াও রাস্তার পাশের বর্জ্যে নোংরা পানি জমে মশার প্রজনন হচ্ছে। সিটি করপোরেশনের অধীন বেশ কিছু এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকলেও দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সেগুলো কার্যত অকার্যকর। ফলে নগরজুড়ে স্থির পানি আর পচা আবর্জনা মশার উপদ্রব বাড়াচ্ছে। ফলে অনেক পরিবার দিনের বেলাতেও মশারি টানিয়ে রাখতে বাধ্য হচ্ছে। মশারি, কয়েল, ইলেকট্রিক ব্যাট কিংবা স্প্রে কোনোটিই যেন স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর রেলগেট এলাকায় রেলওয়ের অফিসের পশ্চিম পাশের সড়কে পানি জমে আছে, একই এলাকার পানিসম্পদ অফিসের সামনে (উপশহর-রেলগেট) সড়কের ড্রেন পরিস্কার না থাকায় সেখানে মশার উপদ্রব বেড়েছে। এছাড়াও নগরীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় সড়কের পাশে ও খোলা জায়গায় স্তূপ করে ফেলা হচ্ছে গৃহস্থালি বর্জ্য। সিটি কপোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মীরা আসতে আসতে যেগুলোতে পঁচন ধরে ময়লা পানি ছড়িয়ে পড়ছে। জমে থাকা এসব পানিতে অসংখ্য মশার লার্ভা দেখা গেছে।
উপশহর এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি চাকুরিজীবি নয়ন আলী বলেন, “সন্ধ্যা নামলেই ঘরে বসে থাকা যায় না। ড্রেন পরিষ্কার না করায় এবং রাস্তার পাশে ময়লা পড়ে থাকায় মশার উৎপাত দিন দিন বাড়ছে। রাসিক যে কি করছে তা আমরা বুঝতে পারছি না। নিয়মিত মশার ওষুধ ও স্পে করা হচ্ছে না। এতে করে মশা দিন দিন বাড়ছে। আমরা নগরবাসী চাই সিটি কপোরেশন থেকে নিয়মিত মশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।”
মশা থেকে সুরক্ষা পেতে ঘুমানোর আগে মশারি টাঙিয়ে ঘুমানোর পরামর্শ জানিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস বলেন,“বর্তমানের আবহাওয়া শীতের শেষ এবং গরমের শুরু। এইসময় মশার উৎপাত একটু বেশি হয়। আমরা কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় দেখেছি রাজশাহীতে ডেঙ্গু রোগীও বাড়ছে। সেজন্য মশা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আমাদের সার্বক্ষনিক ঘুমানোর আগে মশারি টাঙিয়ে নিতে হবে। বাইরে চলাচলের ক্ষেত্রে বৃদ্ধ ও শিশুদের হাতে পায়ে মোজা পরিয়ে রাখতে হবে। এছাড়াও মশার বংশ বিস্তার রোধে বাড়ির আশেপাশের ঝোপ-ঝাড় পরিস্কার রাখতে হবে। সিটি কপোরেশনের পক্ষ থেকেও নিয়মিত ফগার মেশিন এবং মশা মারা ওষুধ ব্যবহার করতে হবে তাহলে নগরীতে মশা নিয়ন্ত্রণ হবে।”
মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি কপোরেশন কাজ করছে জানিয়ে রাজশাহী সিটি কপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিউল করিম বলেন,“নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে মশার লার্ভা নিধনে রাজশাহী সিটি কপোরেশনের পরিচ্ছন্নকর্মীরা কাজ করছে এবং ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। এখন আমের মুকুলের সময় হওয়ায় মশার উৎপাত একটু বেশি। আমরা সার্বিকভাবে মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছি।”
তবে নগরবাসীর দাবি, মাঝে মধ্যে অভিযান নয় নিয়মিত ও সমন্বিত উদ্যোগই পারে মশার এই দৌরাত্ম্য কমাতে। ড্রেন পরিষ্কার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং ধারাবাহিক ফগিং কার্যক্রম নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের। মশার উৎপাত এখন কেবল বিরক্তির বিষয় নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি। তাই দ্রুত কার্যকর ও স্থায়ী পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি রাজশাহীবাসীর।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









