বরিশালের ঐতিহ্যবাহী জনপদ রায়পাশা-কড়াপুর এলাকায় শত প্রজন্ম ধরে দাঁড়িয়ে আছে মিয়াবাড়ি জামে মসজিদ। ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য দলিলে নির্মাতাদের সুনির্দিষ্ট তথ্য না মিললেও স্থাপত্যশৈলী, কারুকাজ ও নান্দনিক সৌন্দর্যে এটি আজও বিস্ময় জাগায় দর্শনার্থী ও মুসল্লিদের মনে।
স্থানীয়দের মতে, এটি দেশের প্রাচীন মসজিদগুলোর অন্যতম। বছরের পর বছর ধরে এখানে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করছেন মুসল্লিরা। জুমা ও ঈদের নামাজে আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে মানুষ ছুটে আসেন। শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, এটি এখন এলাকার ঐতিহ্য ও গৌরবের প্রতীক।
তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদের নির্মাণশৈলীতে স্পষ্ট মোঘল আমলের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। দেয়ালজুড়ে সূক্ষ্ম নকশা ও দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ নজর কাড়ে আগতদের। ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২০টি মিনার মসজিদটিকে দিয়েছে রাজকীয় আবহ।
সবচেয়ে বড় গম্বুজের ভেতরের অংশে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন অলংকরণ, যা সেই সময়কার কারিগরি দক্ষতারই প্রমাণ বহন করে। চুন, সুরকি, মাসকলাই ও চিটাগুড়ের মিশ্রণে তৈরি বিশেষ নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা যায়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো রড ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছে মসজিদের ছাদ, যা এখনো অটুট রয়েছে।
মসজিদের দোতলায় ওঠার সিঁড়ির নিচে রয়েছে দুটি কবর। তবে সেখানে কারা শায়িত আছেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের ধারণা, হয়তো প্রতিষ্ঠাতা বা ধর্মপ্রচারকদের কেউ সেখানে সমাহিত আছেন।
ঠিক কত শতাব্দী আগে মসজিদটি নির্মিত এ বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য না থাকলেও লোকমুখে প্রচলিত আছে, ব্রিটিশ আমলের শুরুতে এক জমিদার এটি নির্মাণ করেন। আবার মিয়া বাড়ির ১৩তম বংশধর মিজানুর রহমানের দাবি, পারস্য থেকে আগত মাহমুদ হায়াত ও জাহিদ নামের দুই ধর্মপ্রচারক মসজিদটি নির্মাণ করেন এবং পাশাপাশি একটি দিঘি খনন করেন। তারা এলাকায় শাসন কার্য পরিচালনার পাশাপাশি ইসলাম প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
মসজিদের নিয়মিত মুসল্লি আবদুল কাদের বলেন, ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি এই মসজিদ। এখানে নামাজ পড়লে এক ধরনের আলাদা প্রশান্তি অনুভব করি। এত পুরোনো স্থাপনায় দাঁড়িয়ে ইবাদত করা সত্যিই সৌভাগ্যের।
আরেক মুসল্লি মো. সাইফুল ইসলাম জানান, দূর-দুরান্ত থেকে মানুষ শুধু নামাজ পড়তেই নয়, মসজিদটি দেখতে আসে। আমরা চাই এর সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ করা হোক।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা মো. রশিদুল ইসলাম বলেন, এই মসজিদ শুধু ইবাদতের জায়গা নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য। সরকারিভাবে সংরক্ষণ ও গবেষণা হলে প্রকৃত ইতিহাস জানা যাবে।
ধর্মীয় উপাসনালয়ের পাশাপাশি এটি এখন দর্শনার্থীদের কাছেও আকর্ষণীয় স্থাপনা। ইতিহাসবিদ ও সচেতন মহলের মতে, মিয়াবাড়ি জামে মসজিদের প্রকৃত ইতিহাস অনুসন্ধানে প্রয়োজন গবেষণা ও প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্যোগ। যথাযথ সংরক্ষণ ও তথ্যসমৃদ্ধ ফলক স্থাপন করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই ঐতিহ্যের সঠিক পরিচয় জানতে পারবে।
শত প্রজন্ম পেরিয়েও বরিশালের রায়পাশা-কড়াপুরের মিয়াবাড়ি জামে মসজিদ আজও সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আধ্যাত্মিকতা, শিল্পনৈপুণ্য ও ইতিহাসের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









