নদী খননে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে নাব্যতা সংকট কাটছে না। বরং নতুন নতুন স্থানে ডুবোচর জেগে ওঠায় ব্যাহত হচ্ছে নৌযান চলাচল। এতে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না যাত্রীবাহী লঞ্চ ও পণ্যবাহী নৌযানগুলো। বাড়ছে জ্বালানি ব্যয়, পাশাপাশি বাড়ছে যাত্রীদের দুর্ভোগও। সংশ্লিষ্টদের দাবি, গত তিন অর্থবছরে প্রায় ৯০ লাখ ঘনমিটার নদী খনন করা হলেও তার বাস্তব সুফল মিলছে না।
সরেজমিনে বরিশাল অঞ্চলের বিভিন্ন নদীপথ ঘুরে দেখা গেছে, বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটে তীব্র নাব্যতা সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কীর্তনখোলা নদীর চরবাড়িয়া এলাকায় জেগে উঠেছে বড় একটি চর। এর ফলে নৌযানগুলোকে সরাসরি পথ ব্যবহার না করে বিকল্প পথ ধরে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হচ্ছে। এতে একদিকে সময় বেশি লাগছে, অন্যদিকে জ্বালানি ব্যয়ও বাড়ছে।
স্থানীয় নৌযান চালকরা জানান, শুধু চরবাড়িয়া অংশেই নয়, বামনী, মিয়ারচর, লালুর চরসহ আরো অন্তত ৮ থেকে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নদীর গভীরতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। অনেক জায়গায় পানির গভীরতা ৪ থেকে ৫ ফুটের নিচে নেমে যাওয়ায় বড় নৌযান চলাচলে মারাত্মক সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
ঢাকা-বরিশাল নৌরুটে চলাচলকারী শুভরাজ-৯ লঞ্চের দ্বিতীয় শ্রেণির মাস্টার বেলাল হোসেন বলেন, ঢাকা-বরিশাল নৌপথে বরিশাল জেলার অংশেই অন্তত ৮ থেকে ১০টি স্থানে নাব্যতা সংকটে পড়তে হয়। অনেক জায়গায় এত কম পানি থাকে যে লঞ্চ ধীরগতিতে চালাতে হয়। এতে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
অভ্যন্তরীণ নৌরুটে চলাচলকারী সঞ্চিতা লঞ্চের এক চালক বলেন, প্রতি বছরই নদীতে ড্রেজিং করা হয়। কিন্তু বাস্তবে তার কোনো সুফল পাওয়া যায় না। নাব্যতা সংকটের কারণে অনেক জায়গায় ধীরগতিতে চলতে হয়। আগে যেখানে দুই ঘণ্টায় পৌঁছানো যেত, এখন সেখানে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। এতে যাত্রীদের সঙ্গে প্রায়ই তর্ক-বিতর্ক হয়।
ড্রেজিং বিভাগ বরিশালের নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, গত তিন অর্থবছরে বরিশাল বিভাগে প্রায় ৯০ লাখ ঘনমিটার নদী খনন করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৩–২৪ অর্থবছরে খনন করা হয়েছে প্রায় ৩১ লাখ ঘনমিটার, ২০২২–২৩ অর্থবছরে ২৫ লাখ ঘনমিটার এবং ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রায় ২৯ লাখ ঘনমিটার নদী খনন করা হয়েছে। এসব খনন কার্যক্রম বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা। কিন্তু এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও নদীপথে চলাচলের সংকট কাটেনি।
নৌপরিবহন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পনা ছাড়াই সীমিত আকারে ড্রেজিং করা হয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই আবারও নদীতে চর জেগে ওঠে এবং নাব্যতা সংকট ফিরে আসে।
এ বিষয়ে ড্রেজিং বিভাগ বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন উর রশিদ বলেন, নদীপথ সচল রাখতে নিয়মিত ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। কোথায় কতটুকু ড্রেজিং প্রয়োজন তা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। নৌপথ সচল রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।
তবে পরিবেশ ও নদী বিষয়ক সংগঠনগুলো বলছে, সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবেই ড্রেজিং কার্যক্রমের কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বরিশালের সমন্বয়কারী মো. রফিকুল আলম বলেন, নদীর নাব্যতা রক্ষায় শুধু খনন করলেই হবে না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ক্যাপিটাল ড্রেজিং এবং মেইনটেইনেন্স ড্রেজিংয়ের সমন্বিত কার্যক্রম চালাতে হবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িয়ে যাওয়ায় কার্যকর ড্রেজিং সম্ভব হয় না।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগের অন্তত ৪২টি নদ-নদীর প্রায় ৬২৯ কিলোমিটার এলাকায় ডুবোচর সৃষ্টি হয়েছে। এসব ডুবোচর নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে এবং ধীরে ধীরে নদীর নাব্যতা কমিয়ে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি, যাত্রী পরিবহন এবং পণ্য পরিবহনের একটি বড় অংশ এখনো নদীপথের ওপর নির্ভরশীল। তাই নদীর নাব্যতা সংকট দ্রুত সমাধান করা না গেলে ভবিষ্যতে নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে।
তাদের মতে, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং স্বচ্ছতার মাধ্যমে ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে নদীর নাব্যতা রক্ষা করা সম্ভব হবে। অন্যথায় প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও দক্ষিণাঞ্চলের নদীপথে এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









