“এত টাকা খরচ করে পেঁয়াজ লাগাইলাম কিন্ত এখন বেঁচতে গিয়ে দেখি পেঁয়াজের দাম নেই। আমরা কৃষক, আমাদের কথা কেউ ভাবে না। সার-বিষের যে দাম তা দিয়ে এত কষ্ট করে পেঁয়াজ লাগাইয়া এখন আমরা নায্য দাম পাচ্ছি না।”- কথাগুলো বলছিলেন রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার পিল্লাপাড়া গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম।
তিনি বলেন, “আমরা যখন ফসল লাগাইতে যাই তখন সার-বিষ পাই না। কত কষ্ট করে আমরা আবাদ করি। কিন্ত দিন শেষে যখন পণ্য বাজারে বিক্রি করতে যাই, তখন আর দাম পাই না। এক মণ পেঁয়াজ চাষ করতে আমাদের খরচ হয়েছে ১৬ থেকে ১৮’শ টাকা, কিন্ত আমরা দাম পাচ্ছি ১ হাজার থেকে ১২’শ টাকা। এত টাকা লস কি মানা যায়?”
শুধু রবিউল নয়, রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলার কৃষকদের চিত্র একই। বিভিন্ন উপজেলায় এ বছর পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হলেও বাজারে ন্যায্য দাম না পাওয়ায় চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন কৃষকেরা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন উপজেলার মাঠে এখন পেঁয়াজ তোলার ব্যস্ততা চলছে। কৃষকেরা ক্ষেত থেকে পেঁয়াজ তুলে বস্তাবন্দি করে বাজারে নিয়ে যাচ্ছেন। কোথাও কোথাও পেঁয়াজের মুড়ি কেটে রৌদে শুকাতে দেওয়া হয়েছে।
তবে উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে দাম কম থাকায় চাষিদের মুখে হাসির বদলে দেখা যাচ্ছে হতাশা। বাম্পার ফলন হলেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কায় দিন কাটছে তাদের। অনেকে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে জমি বর্গায় পেঁয়াজ চাষ করেছেন। উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় অনেক কৃষক যেন বোবা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। শত পরিশ্রম করে ফসল ফলালেও বাজারে গিয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।
জেলার পবা, পুঠিয়া, চারঘাট, তানোর ও গোদাগাড়ীসহ বিভিন্ন উপজেলায় পেঁয়াজের চাষ ব্যাপকভাবে হয়ে থাকে। চলতি মৌসুমে অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষি বিভাগের পরামর্শে ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় পাইকারি বাজারে দাম পড়ে গেছে। ফলে উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না কৃষকেরা।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করতে বীজ, সার, সেচ, শ্রমিকসহ প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে স্থানীয় হাটবাজারে কৃষকেরা প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি করছেন মাত্র ১ হাজার থেকে ১৩’শ টাকায়। এতে উৎপাদন খরচই উঠছে না বলে অভিযোগ তাদের।
রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ঝলমলিয়া এলাকার কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, “সারা বছর কষ্ট করে পেঁয়াজ চাষ করলাম। এখন বাজারে নিয়ে গেলে যে দাম পাচ্ছি তাতে খরচই উঠছে না। ঋণ করে চাষ করেছি, এখন কীভাবে সেই টাকা শোধ করব বুঝতে পারছি না।”
চারঘাট উপজেলার কৃষক নুর ইসলাম জানান, “আমরা ভেবেছিলাম এবার ফলন ভালো হয়েছে, কিছু লাভ হবে। কিন্তু এখন যে দাম, তাতে পেঁয়াজ বিক্রি করলেও লোকসান, আবার ঘরে রাখলেও পচে যাওয়ার ভয়। কী করব বুঝতে পারছি না।”
কৃষকেরা অভিযোগ করছেন, মধ্যস্বত্বভোগী ও পাইকারদের দৌরাত্ম্যের কারণেও তারা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। অনেক সময় আড়তদাররা কম দামে পেঁয়াজ কিনে মজুদ করে পরে বেশি দামে বিক্রি করেন। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও লাভবান হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
রাজশাহীর কয়েকজন আড়তদার অবশ্য বলছেন, বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ অনেক বেশি হওয়ায় দাম কমে গেছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় একসঙ্গে পেঁয়াজ ওঠায় বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। এদিকে কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে প্রায় প্রতি বছরই একই সমস্যায় পড়তে হয় কৃষকদের। পর্যাপ্ত হিমাগার বা সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকেরা বাধ্য হয়ে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করে দেন।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মার্চ মাসের ১২ তারিখ পর্যন্ত চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে ২১ হাজার ৪৭২ হেক্টর জমিতে। যার ভিতরে মুড়ি কাটা পেঁয়াজ চাষ হয়েছে ৮ হাজার ৩৪৪ এবং আল পেঁয়াজ ১৩ হাজার ১২৮ হেক্টর জমিতে।
এ বছর পেঁয়াজের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৪ লাখ ২৫ হাজার ৮৮০ মেট্রিক টন, যা গতবছর ছিল ৪ লাখ ১২ হাজার ৭৯৬ মেট্রিক টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা। পাওয়া তথ্যনুযায়ী গতবছরের তুলনায় চলতিবছর ১৩ হাজার ৮৪ মেট্রিক টন আবাদ বেশি হওয়ার আশা করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, “এ বছর চাহিদার তুলনায় পেঁয়াজের উৎপাদন বেশি হয়েছে। ডিমান্ড এবং সাপ্লাইয়ে ভারসাম্য না থাকায় কৃষকেরা পেঁয়াজের দাম পাচ্ছেন না। বর্তমানে সরকার পেঁয়াজ আমদানিও বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা সবসময় কৃষকদের বলি চাহিদা অনুযায়ী আবাদ করতে। এই সময় কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নয়ন ও বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ প্রয়োজন।”
স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, ন্যায্য দাম নিশ্চিত না হলে আগামী বছর অনেকেই পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ হারাবেন। এতে ভবিষ্যতে উৎপাদন কমে গিয়ে বাজারে আবার দাম বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









