বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনা-বাঙালি বিধৌত উর্বর মাটিতে সরিষা চাষে নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করেছেন মালয়েশিয়া প্রবাসী সামিউল ইসলাম। গতানুগতিক দেশি জাতের পরিবর্তে ভিয়েতনামের উচ্চ ফলনশীল ‘স্মিতা ৭৭৭’ জাতের সরিষা চাষ করে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন তিনি। প্রবাস জীবনের কর্মব্যস্ততা শেষে নিজ ভিটায় ফিরে আধুনিক কৃষিতে সামিউলের এই উদ্ভাবনী উদ্যোগ এখন স্থানীয় কৃষকদের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের জোড়গাছা এলাকার বাসিন্দা সামিউল ইসলাম দীর্ঘদিন মালয়েশিয়ায় কর্মরত ছিলেন। প্রবাস জীবন শেষ করে দেশে ফেরার পর তিনি গতানুগতিক ধারার বাইরে লাভজনক কিছু করার পরিকল্পনা করেন। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তিনি অনলাইনে চুয়াডাঙ্গার এক খামারির কাছ থেকে ভিয়েতনামের এই বিশেষ জাতের বীজের সন্ধান পান। পরবর্তীতে সেখান থেকেই ‘স্মিতা ৭৭৭’ জাতের বীজ সংগ্রহ করে নিজের ২৬ শতাংশ জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করেন।
সামিউলের সরিষা ক্ষেতে গিয়ে দেখা যায়, সাধারণত দেশি জাতের সরিষা গাছ ২-৩ ফুট লম্বা হলেও ভিয়েতনামের এই জাতটি বিস্ময়করভাবে ৫ থেকে সাড়ে ৫ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়েছে। গাছগুলো দেখতে অনেকটা ছোটখাটো অড়হর গাছের মতো এবং প্রচুর শাখা-প্রশাখা বিশিষ্ট।
সামিউল ইসলাম জানান, এই জাতটি রোপণে তিনি বিশেষ দূরত্ব বজায় রেখেছেন। প্রতিটি চারা থেকে চারার দূরত্ব দৈর্ঘ্যে ৩৬ ইঞ্চি এবং প্রস্থে ২৭ ইঞ্চি রেখে রোপণ করা হয়েছে। এই পদ্ধতি অনুসরণের ফলে প্রতিটি গাছ পর্যাপ্ত জায়গা পেয়েছে এবং ডালপালাগুলো চারদিকে সুবিন্যস্তভাবে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। ফলে প্রতিটি গাছে সাধারণের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি ফলন আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে সরিষা ক্ষেতটি হারভেস্ট বা ফসল সংগ্রহের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সামিউল ইসলাম জানান, ২৬ শতাংশ জমিতে যে পরিমাণ ফলন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাতে তিনি খরচ বাদে বড় অংকের মুনাফার আশা করছেন। তিনি বলেন, প্রবাস থেকে ফিরে আমি নতুন কিছু করতে চেয়েছিলাম। অনলাইনে এই জাতটি দেখে ঝুঁকি নিয়েছিলাম, এখন দেখছি ফলন প্রত্যাশার চেয়েও ভালো। এই সরিষার দানা আকারে বড় এবং তেলের গুণমানও চমৎকার।
সামিউলের এই বিশাল আকৃতির সরিষা গাছ এবং বাম্পার ফলন দেখতে প্রতিদিন উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কৃষকরা ভিড় করছেন। স্থানীয় কৃষকরা জানান, তারা আগে কখনও এত লম্বা এবং শাখা-প্রশাখা বিশিষ্ট সরিষা গাছ দেখেননি। অল্প জমিতে অধিক ফলন পাওয়ার এই কৌশল দেখে অনেকেই আগামী মৌসুমে ‘স্মিতা ৭৭৭’ জাতটি চাষ করার আগ্রহ প্রকাশ করছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এদিন প্রতিবেদককে জানান, সারিয়াকান্দির মতো নদী অববাহিকায় যদি এই ধরনের উচ্চ ফলনশীল জাতের সরিষা চাষ ব্যাপক হারে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে তা দেশের ভোজ্যতেলের ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে প্রবাস ফেরত যুবকরা যদি সামিউল ইসলামের মতো আধুনিক কৃষি প্রযুক্তিতে সম্পৃক্ত হন, তবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন আসবে।
সরিষা বিপ্লবের এই নতুন ধারা কেবল সামিউলকে স্বাবলম্বী করেনি, বরং সারিয়াকান্দির চরাঞ্চল ও সমতলের কৃষিতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









