বরিশাল নগরীর ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা চকবাজার, রমজান এলেই যার চিত্র বদলে যায় পুরোপুরি। ঈদের কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এখানে দেখা মেলে দূরদূরান্ত থেকে আসা শতাধিক ভিক্ষুকের। এদের অনেকেই সারা বছর ভিন্ন পেশায় থাকলেও রমজান মাসে ভিক্ষাবৃত্তিকে বেছে নিচ্ছেন বাড়তি আয়ের উৎস হিসেবে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি সত্যিকারের অসহায় মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই, নাকি পরিকল্পিত ‘মৌসুমি ব্যবসা’?
রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাসিন্দা ৫৫ বছর বয়সী মোস্তফা রহমান এমনই এক ব্যক্তি, যিনি নিজ এলাকায় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত। তবে রমজান এলেই তিনি পরিচয় গোপন রেখে ভিক্ষুকের বেশে চলে আসেন বরিশালে। চকবাজার এলাকায় অবস্থান নিয়ে পুরো মাসজুড়ে ভিক্ষা করেন। ঈদের দিন সকালে আবার ফিরে যান নিজ বাড়িতে।
প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে মোস্তফা রহমান জানান, রমজান মাসে চকবাজার এলাকায় মানুষের ভিড় বেশি থাকায় এখানে ভিক্ষা করে ভালো আয় হয়। তার দাবি, প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা আয় করেন। কখনো কখনো কোনো দাতা একাই ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা দিয়ে দেন, সেদিন আয় দাঁড়ায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকায়। পুরো মাস মিলিয়ে প্রায় দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত আয় সম্ভব বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, শুধু টাকা নয়, অনেক সময় খাবারও পাই। এখানে ভাড়া বাসায় থাকি। আগে হোটেলে থাকতাম, এখন পরিচিত এক ব্যক্তির বাসায় উঠেছি। পঙ্গুত্বের কারণে ভিক্ষা করতে তার বাড়তি সুবিধা হয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
শুধু মোস্তফা রহমানই নন, চকবাজার এলাকায় এমন আরও বহু ‘মৌসুমি ভিক্ষুক’ দেখা যায়। গীর্জা মহল্লার মোড় থেকে চকেরপুল পর্যন্ত অন্তত ৬০ জন ভিক্ষুক প্রতিদিন অবস্থান নেন। এদের মধ্যে বরগুনা, ভোলা, চাঁদপুর, যশোর, বগুড়া, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলার মানুষ রয়েছেন।
যশোর থেকে আসা শাহীন হাওলাদার জানান, তিনি সারা বছর দিনমজুরের কাজ করেন, তবে গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে রমজান মাসে বরিশালে এসে ভিক্ষা করছেন। এখানে ৫-১০ টাকার ভিক্ষা কমই পাওয়া যায়, ভালোই আয় হয়, বলেন তিনি। পুরো মাস একটি সস্তা হোটেলে থেকে ফুটপাতে বসে ভিক্ষা করেন।
বরগুনা থেকে আসা জাকিরুল বলেন, চকবাজারে যারা আসে, তারা মূলত কেনাকাটা করতে আসে। তাই এখানে ভিক্ষা পাওয়া সহজ। এক মাসের আয় দিয়ে অনেকটা বছর চালানো যায়। তবে খারাপ আবহাওয়ার কারণে কিছুদিন আয়ে ভাটা পড়েছে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই মৌসুমি ভিক্ষুকদের উপস্থিতি মাঝে মাঝে সমস্যা তৈরি করে। কুন্ডেশ্বরী বস্ত্রালয়ের স্টাফ নিরঞ্জন মন্ডল জানান, “রমজান ছাড়া এদের কাউকে দেখা যায় না। হঠাৎ করে এসে জায়গা দখল করে বসে পড়ে।
অন্যদিকে ময়ূরী বস্ত্রালয়ের সেলসম্যান কায়ছার হোসেন বলেন, একজনের জায়গায় অন্যজন বসলে ঝগড়া হয়, কখনো মারামারিও হয়। তখন আমাদেরই গিয়ে মিটমাট করতে হয়।
এ বিষয়ে সামাজিক বিশ্লেষকরা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরছেন। অমৃতলাল দে মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক দেবাশীষ চক্রবর্তী বলেন, এটি আর প্রচলিত অর্থে ভিক্ষাবৃত্তি নয়, বরং এক ধরনের পার্টটাইম পেশা বা ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের কারণে প্রকৃত অসহায় মানুষ ভিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি বিষয়টিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানান।
বরিশাল জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ পারভেজ বলেন, ভিক্ষাবৃত্তি কখনোই ব্যবসা হতে পারে না। মানুষ বাধ্য হয়ে ভিক্ষা করে। কিন্তু কেউ যদি এটিকে আয়ের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে তা অন্যায়।
তিনি জানান, সরকার ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন ও স্বাবলম্বী করতে নানা কর্মসূচি চালু রেখেছে।
রমজানের পবিত্রতা ও দানের মানসিকতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই ‘মৌসুমি ভিক্ষা অর্থনীতি’ এখন সামাজিক ও নৈতিক প্রশ্নের মুখে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









