ঝিনাইদহে বাউল গানে কৃষকের ঈদ সন্ধ্যা, জিলেপি ও মুড়ির অ্যাপায়নে সামাজিক মিলনমেলা উদযাপিত হয়েছে। পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার হাবিবপুর গ্রামে অনুষ্ঠিত হলো ব্যতিক্রমী আয়োজন ‘কৃষকের ঈদ সন্ধ্যা’।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘দয়াল ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে রোববার (২২ মার্চ) সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়ে গভীর রাত পর্যন্ত চলে এই উৎসব। মাটির ঘ্রাণ আর শিকড়ের টানে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল বাঙালির চিরচেনা বাউল গান। ঈদের খুশিতে বাড়তি মাত্রা যোগ করতে ফাউন্ডেশনের অন্বেষণ প্রাঙ্গণে গাছ-পালা ঘেরা বিস্তীর্ণ ভূমিতে এই আসর বসে। এ অনুষ্ঠানে ধর্ম-বর্ণ-পেশা-নির্বিশেষে গ্রামের মানুষের সমাবেশ ঘটে।
সম্প্রতি সড়ক দুর্ঘটনায় অকাল প্রয়াত লেখক ও কবি রফিক রেজাকে উৎসর্গ করে কৃষকের ঈদ সন্ধ্যা আয়োজন করা হয়। বাউল শিল্পীদের একতারা আর দোতারার সুরে মেতে ওঠেন কৃষক, নারী ও শিশুরা। শুধু হাবিবপুর গ্রামই নয়, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও শত শত সঙ্গীতপ্রেমী মানুষ ভিড় জমান এই মরমি গানের আসর শুনতে। গানের তালে তালে উৎসবের আমেজ বাড়িয়ে দেয় ঐতিহ্যবাহী আপ্যায়ন। অনুষ্ঠানে আগত দর্শকদের পরিবেশন করা হয় ধোঁয়া ওঠা গরম জিলিপি আর মুড়ি। গ্রামীণ ঐতিহ্যের এমন মিলনমেলায় গ্রামবাসী যেন ফিরে পেয়েছিলেন তাদের হারিয়ে যাওয়া শিঁকড়।
অনুষ্ঠানে আসা আব্দুল কুদ্দুস নামের একজন কৃষক বলেন, ‘সারাদিন রোদে পুড়ে কাম করি। ঈদে একটু আনন্দ করার সুযোগ পাই না। কিন্তু আজ জিলিপি-মুড়ি খাতি খাতি বাউল গান শুনে মনটা জুড়িয়ে গেল। আমাগের মতো কৃষকের জন্য এমন আয়োজন আগে দেহিনি।’
পরিবারের সাথে গান শুনতে আসা রহিমা খাতুন নামের এক নারী বলেন, ‘সংসারের চাপে বাইরে যাওয়ার সময় হয় না। বাড়ির পাশেই এতো সুন্দর গানের আসর দেখে খুব ভালো লাগছে। বাচ্চারাও জিলিপি খেয়ে খুব খুশি। আমরা চাই এমন আয়োজন প্রতি বছর হোক।’
সাংস্কৃতিক সংগঠক মিরাজ হোসেন বলেন, ‘আমাদের প্রিয় একজন মানুষ ছিলেন কবি রফিক রেজা। তিনি শিল্প ও সাহিত্যের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত ছিল। বিশেষ করে গবেষণাভিত্তিক লালন শাহের নিয়ে তার লেখা ছিল। অকালে তার মৃত্যু সাংস্কৃতিকঅঙ্গনে বড় ক্ষতি হয়ে গিয়েছে। তাকে স্মরণ করে দয়াল ফাউন্ডেশন কৃষকদের নিয়ে যে আয়োজন করেছে আমরা তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’
বাউল শিল্পী মানিক জোয়ার্দ্দার বলেন, ‘আমরা গান গাই মানুষের জন্য, মাটির জন্য।’ তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘আগে গ্রাম-গঞ্জে প্রচুর বাউল গানের আসর হতো, রাতভর মানুষ গান শুনত। কিন্তু এখন আর আগের মতো এসব আয়োজন চোখে পড়ে না, বাউল গান যেন ধীরে ধীরে উঠেই যাচ্ছে। মানুষ এখন যান্ত্রিক বিনোদনে মজেছে। দয়াল ফাউন্ডেশনের মতো হাতেগোনা কিছু সংগঠন ছাড়া এখন কেউ আমাদের ডাকে না। সরকারের কাছে অনুরোধ, আমাদের এই হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি আর প্রান্তিক শিল্পীদের দিকে যেন একটু নজর দেওয়া হয়। পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে এই অমূল্য সম্পদ বিলীন হয়ে যাবে।’
আয়োজিত ঈদ সন্ধ্যায় কৃষক ভাবনার আদান-প্রদান, সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি ও মনের ব্যথা মেটানোর প্রয়াস দাবি করে অনুষ্ঠানের আয়োজক দয়াল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সুপ্রিম কোর্টের অ্যাড. লাবাবুল বাশার দয়াল বলেন, 'বয়োবৃদ্ধ, তরুণ, মধ্যবয়সী, শিশু, কিশোর, নারী-পুরুষের সমাগমে সামাজিক সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের মিলন মেলায় পরিণত অকাল প্রয়াত কবি রফিক রেজা স্মরণে অনুষ্ঠিত কৃষকের ঈদ সন্ধ্যা আয়োজন থেকে নতুন চিন্তা-ভাবনা ও কর্মপদ্ধতির আবিষ্কার হবে বলে আমরা আশবাদী। আমরা চেয়েছি ঈদ যেন শুধু বড়লোকদের না হয়, এই আনন্দ যেন মাঠের কৃষকের দুয়ারেও পৌঁছায়। বাউল গান আমাদের মাটি ও মানুষের কথা বলে। গ্রাম বাংলার এই হারানো ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতেই আমরা কৃষকের ঈদ সন্ধ্যার আয়োজন করেছি। মানুষের ভালোবাসা পেলে আমরা ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এই উৎসব চালিয়ে যাবো।’
গভীর রাত পর্যন্ত চলে এই বাউল সন্ধ্যার আসর। গান ও আড্ডায় স্থানীয় কৃষকরা তাদের প্রতিদিনের ক্লান্তি ভুলে এক আনন্দঘন সময় অতিবাহিত করেন। উপস্থিত দর্শকদের মতে, বর্তমানের যান্ত্রিক যুগে এমন দেশীয় সংস্কৃতির আয়োজন সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় করতে সাহায্য করবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









