বরগুনার তালতলী উপজেলায় যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন ও স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের হুমকিতে লামিয়া (১৯) নামের এক নববধুর গ্যাস ট্যাবলেট খেয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
রবিবার (২২ মার্চ) দিবাগত রাতে তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় থানায় অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে।
জানা গেছে, উপজেলার বড়বগী ইউনিয়নের চরপাড়া গ্রামের প্রবাসী জাহাঙ্গীর গাজীর মেয়ে লামিয়ার সঙ্গে প্রায় ১০ মাস আগে নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের মোয়াপাড়া গ্রামের বেল্লাল হাওলাদারের ছেলে আরিফ বিল্লাহর পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়।
মেয়ের পরিবার সূত্রে জানা যায়, বিয়ের সময় উভয় পরিবারের মধ্যে সমঝোতা ছিল লামিয়ার বাবা মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরলে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে শ্বশুরবাড়িতে তুলে দেওয়া হবে। কিন্তু এর আগেই স্বামীর পরিবার তাকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যায়। বিয়ের সময় প্রায় ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে স্বর্ণের আংটি উপহার দেওয়া হয় এবং মেয়েকে একটি নাকফুল দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, শ্বশুর বেল্লাল হাওলাদার, শাশুড়ি আসিয়া বেগম ও দেবর আতিকুর যৌতুকের দাবিতে লামিয়ার ওপর নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন। একপর্যায়ে স্বামী তাকে ঢাকায় নিয়ে যান। কিন্তু সেখানেও অবহেলা অব্যাহত থাকে। এমনকি সংসারের ন্যূনতম খরচ ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও তাকে ঠিকমতো দেওয়া হতো না বলে অভিযোগ পরিবারের।
নিহতের মা হামিদা বেগম বলেন, বিয়ের সময় তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী স্বর্ণের আংটিসহ বিভিন্ন উপহার দেওয়া হয়েছিল। এরপরও তার মেয়ের ওপর নির্যাতন চালানো হয় এবং বারবার টাকা দাবি করা হতো।
তিনি অভিযোগ করেন, টাকার জন্যই তার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে এবং তিনি এর সঠিক বিচার দাবি করেন।
পরিবারের অভিযোগ, ব্যবসার জন্য ২ লাখ টাকা দাবি করে লামিয়াকে খাবার দেওয়া হতো না এবং না খাইয়ে রাখা হতো। নির্যাতনের বিষয়গুলো লামিয়া তার মুঠোফোনে রেকর্ড করে রাখেন। বিষয়টি টের পেয়ে স্বামী কৌশলে তাকে ঢাকা থেকে তালতলী বাজারে এনে এক সাংবাদিক এনে তার সামনে ভিডিও ধারণ করান এবং পরবর্তীতে তার মুঠোফোনটি জোরপূর্বক নিয়ে নেওয়া হয় বলে তারা দাবি করেন।
পরিবার জানায়, এসব ঘটনার কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা জামাতার মোবাইল নম্বর ব্ল্যাকলিস্টে রাখেন। তবে লামিয়া বিভিন্নভাবে স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যান। ২৮ রমজানে শ্বশুর বেল্লাল হাওলাদার পুত্রবধূর জন্য ঈদের কেনাকাটা করলেও দাবিকৃত ২ লাখ টাকা জোগাড় না হওয়ায় তা ফেরত দেওয়া হয়। এতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন লামিয়া। প্রবাসী বাবা টাকা পাঠাতে ব্যর্থ হওয়ায় ঈদের দ্বিতীয় দিন স্বামী দ্বিতীয় বিয়ের হুমকি দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পরিবারের দাবি, গত ২২ মার্চ রাত আনুমানিক ৮টা ৩০ মিনিটে বাবার বাড়িতে লামিয়া চাল সংরক্ষণের বিষাক্ত গ্যাস ট্যাবলেট সেবন করেন। গুরুতর অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে তালতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে রাত আনুমানিক ১টার দিকে তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় থানায় অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হলেও আদালতে আত্মহত্যার প্রচারণার মামলা করা হবে।
অন্যদিকে, নিহতের স্বামী আরিফ বিল্লাহ মুঠোফোনে দাবি করেন, পারিবারিকভাবে বিয়ে হলেও তার স্ত্রী তাকে পছন্দ করতেন না এবং সংসার করতে চাননি।
তিনি বলেন, তাদের পক্ষ থেকে কোনো যৌতুক দাবি করা হয়নি এবং শ্বশুরবাড়ি থেকে কিছু নেওয়া হয়নি। তবে উপহার হিসেবে একটি আংটি দেওয়া হয়েছিল।
তিনি আরো বলেন, রমজানে স্ত্রী বাবার বাড়িতে গেলে তিনি নিজেই পৌঁছে দেন এবং পরে পরিবারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তালতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি তদন্ত) মো. শরিফুল ইসলাম জানান, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় তালতলী থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









