পবিত্র ঈদুল ফিতরের টানা ছুটিতে যমুনার তপ্ত বালুচর আর শীতল জলরাশি এখন উৎসবপ্রেমীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনা নদীর পাড় ঘেঁষে নির্মিত কালিতলা গ্রোয়েন ও প্রেম যমুনার ঘাট (দিঘলকান্দি হার্ড পয়েন্ট) এলাকায় এখন তিল ধারণের জায়গা নেই। এছড়াও হাটশেরপুর ইউনিয়নের হাসনাপাড়া স্পার, কর্ণিবাড়ি ইউনিয়নের মথুরাপাড়া হার্ড পয়েন্ট ও ফিসপাস, কুতুবপুরের নদী তীর রক্ষা বাঁধ এলাকাতেও ছিল দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। ঈদের দিন বিকেল থেকে শুরু হওয়া এই জনস্রোত আজ মঙ্গলবারও (২৪ মার্চ) অব্যাহত রয়েছে, যা উত্তরবঙ্গের পর্যটন মানচিত্রে সারিয়াকান্দি ও যমুনাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
বগুড়া শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সারিয়াকান্দির ‘কালিতলা গ্রোয়েন’ এবং ‘প্রেম যমুনার ঘাট’। মূলত এই দুটি পয়েন্টকে কেন্দ্র করেই পর্যটকদের মূল আকর্ষণ। বিশাল যমুনার নাব্য সংকটে কালিতলা গ্রোয়েন এলাকায় হেঁটেই নদী পার হচ্ছেন দর্শনার্থীরা। যমুনার ওপারের চরের দৃশ্য উপভোগ করতে দূর-দূরান্ত থেকে মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে ভিড় জমাচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। শুধু বগুড়া নয়, পার্শ্ববর্তী জয়পুরহাট, গাইবান্ধা ও সিরাজগঞ্জ জেলা থেকেও অসংখ্য পর্যটকের আগমন ঘটেছে।

বিগত সময়ে যমুনার বুকে ছোট-বড় কয়েকশ’ ইঞ্জিনচালিত নৌকা পর্যটকদের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম হলেও এবছর যমুনার নাব্য সংকটের কারণে শুধু ছোট নৌকাগুলো চলছে৷ পর্যটকরা দলবেঁধে নৌকায় চড়ে মাঝ নদীতে জেগে ওঠা চরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের মাঝে নৌকায় চড়ে সেলফি তোলা এবং বালুচরে ফুটবল বা ক্রিকেট খেলার ধুম পড়েছে।
কালিতলা ঘাটের নৌকা চালক আলমগীর হোসেন বলেন, ঈদের দিন থেইকাই আমাগো দম ফেলার সময় নাই। সকাল থেইকা রাত পর্যন্ত খেয়া দিয়াও মানুষ শেষ করতে পারি না। নদীর পানি কমে যাওয়ার কারণে সময় বেশি লাগছে। ইনকাম আগের মতো ওতো বেশি হচ্ছে না।
পর্যটকদের এই বিশাল সমাগমকে কেন্দ্র করে সারিয়াকান্দির স্থানীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। যমুনা পাড়ে অস্থায়ীভাবে গড়ে ওঠা শ'খানেক খাবারের দোকান, খেলনা ও প্রসাধনীর স্টলে বিক্রি বেড়েছে কয়েক গুণ। এছাড়াও এলাকার তরুণদের উদ্যোগে বসেছে ভ্রাম্যমাণ মেলা। সেখানে দর্শনার্থীদের বিনোদনের জন্য নাগরদোলা, চরকি, নৌকা সহ ছোটদের জন্য জাম্পিং ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় হোটেলগুলোতে পর্যটকদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, ঈদের এই কয়েক দিনে ভালো বেচা-কেনার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিপুল সংখ্যক মানুষের ভিড় সামলাতে এবং অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা এড়াতে সারিয়াকান্দি থানা পুলিশের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। যমুনা পাড়ের প্রধান পয়েন্টগুলোতে পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে।

পর্যটকদের আগমন বাড়লেও কিছু অবকাঠামোগত সমস্যার কথা উঠে এসেছে দর্শনার্থীদের মুখে। বগুড়া থেকে আসা এক পর্যটক দম্পতি জানান, জায়গাটা অনেক সুন্দর, কিন্তু পর্যটকদের বসার জন্য পর্যাপ্ত ছাউনি নেই। পার্কিংয়ের সুব্যবস্থা না থাকায় রাস্তায় যানজট লেগে থাকছে। এতে বেশি সময় অপচয় হচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সারিয়াকান্দির যমুনা পাড়কে যদি পরিকল্পিতভাবে আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তবে এটি সরকারের রাজস্ব আয়ের বড় উৎস হতে পারে। পর্যটকদের জন্য স্থায়ী রেস্ট হাউস, পার্ক এবং নদীর পাড়ে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করলে সারিয়াকান্দি হবে উত্তরবঙ্গের 'মিনি কক্সবাজার'।
সারিয়াকান্দি থানা অফিসার ইনচার্জ আ ফ ম আছাদুজ্জামান এদিন প্রতিবেদককে জানান, যানজট নিরসনে পুলিশ ঈদের আগে থেকেই কাজ করে আসছে। ঈদের দিন থেকে সারিয়াকান্দির বিভিন্ন পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে যানজট নিয়ন্ত্রণ করে পর্যটকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমাইয়া ফেরদৌস এদিন প্রতিবেদককে জানান, ঈদ উপলক্ষে দর্শনীয় স্থানগুলোতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিভিন্ন পয়েন্টে গুরুত্বপূর্ণ ফোন নাম্বার সরবরাহ করা হয়েছে, যাতে কেউ সমস্যার সম্মুখীন হলে দ্রুত সাহায্য পেতে পারেন। এছাড়াও দর্শনীয় স্থানগুলোতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হবে। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলেচনার মাধ্যমে দর্শনার্থীদের বসার জায়গা বৃদ্ধির কথাও বলেছেন তিনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









