রাজাকার বাহিনী আমাদের গ্রামে ঢুকে প্রথমে সব বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনের লেলিহান শিখার আতঙ্কে আমরা বাড়ি ঘর ছেড়ে ঝোপঝাড় আর বাগানের মধ্যে লুকিয়ে পড়ি। এ সময় রাজাকাররা হুইসেল বাজিয়ে আমাদের সব বাড়িতে লুটপাট করে। তারা আমাদের খুঁজতে থাকে। সেদিন যেসব পুরুষকে তারা খুঁজে পায় প্রত্যেককে নির্মমভাবে হত্যা করে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও সেদিনের নির্মম স্মৃতি ভুলতে পারেনি গনহত্যার শিকার শরণখোলা উপজেলার লাকুরতলা গ্রামের হিন্দু পাড়ার বাসিন্দারা। আজও তাদের কান্না থামেনি। ওই গ্রামের বিরলা রানী (৮৫),শোভারানী (৭০) ও ঊষা রানী (৭৫) সেদিনের তাণ্ডবের স্মৃতিচারণ করে এখনো ডুকরে কাঁদে। দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে এখনো তাদের যুদ্ধ চলছে জীবনের সাথে।
গনহত্যার নির্মম পাশবিকতার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তারা বলেন, সেদিন আমাদের গ্রামের মহানন্দ সমাদ্দার, মনিন্দ্র সাধক, বিমল সাধক, অটল কুলু, মনোরঞ্জন কুলু, গোপাল চন্দ্র হালদার, নীরোদ বিহারী কুলু ও অনন্ত হালদার সহ অনেককে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়।
বিরলা রানী বলেন, পুরুষদের খুঁজতে গিয়ে রাজাকাররা আমাকে ধরে ফেলে। রাইফেল দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করে। অশ্লীল গালিগালাজের পর আমার সিঁথি থেকে সিঁদুর মুছে দেয়।
ঊষা রানী সেদিনের তাণ্ডবের কথা মনে করে বলেন, কোন মানুষের জীবনে যেন এমন সময় না আসে। সেদিনের কথা মনে পড়লে এখনো আতঙ্কে গা শিউরে ওঠে।
শোভারানী বলেন, রাজাকাররা আমার পিতা মহানন্দ সমদ্দার আর স্বামী মনিন্দ্র সাধক কে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যার পর তাদের ক্ষত বিক্ষত লাশ লাকুড়তলা খালে ভাসিয়ে দেয়। একই দিনে আমার মা মানকুমারী আর আমি বিধবা হয়ে যাই। একই দিনে মা আর মেয়ের সিথির সিঁদুর মুছে যায় আমাদের। বলতে বলতে নিজের বিবর্ণ আচলে চোখ মুছতে থাকেন শোভা রানী। বলতে থাকেন তা জীবনের ৫৫ বছরের কষ্ট গাঁথা।
বাবাকে আর স্বামীকে হারিয়ে মায়ের সাথে আমার কোলের দু'বছরের মেয়ে সুরবালাকে নিয়ে প্রথমে তাফালবাড়ি, পরের দিন বগীতে পৌছাই। সেখানে অনেকের সাথে করে নৌকায় করে ভারতে পাড়ি জমাই। নৌকায় আমাদের প্রায় এক মাস ভাসতে হয় জলে আর জঙ্গলে। আমাদের কাছে তেমন টাকা পয়সা আর খাবার না থাকায় কত সময় যে না খেয়ে কাটাতে হয়েছে তা মনেও করতে পারছি না। বাড়িতে রাজাকাররা লুটপাট করে টাকা পয়সা ও সোনাদানা নিয়ে যাওয়ায় প্রায় খালি হাতে নৌকায় উঠতে হয়েছিল।খাবারের অভাবে দুই বছরের শিশু কন্যা সুরবালা'র সে কষ্ট আজও ভুলতে পারিনি।
বুক ভরা নিশ্বাস ছেড়ে শোভারানী আরো বলেন, আমার বাবাকে হত্যা করায় আমার মা মানকুমারী আমাদের পাঁচটি ভাই বোনকে যেমন অভাব - অনটনে বড় করেছেন; ঠিক তেমনি আমিও আমার কন্যা সুরবালা কে কঠিন অনটনে বড় করেছি। ৫৫ বছরের জীবনে সে পায়নি পিতার আদর। আমার মত আমার কন্যাও বেড়ে উঠেছে পিতা হারানোর শোক নিয়ে।
৭১ এ নির্মম গনহত্যায় পিতা হারানো সুরবালা বলেন, অভাব অনটনের সংসারে আমাদের চার সন্তানের মধ্যে তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। একমাত্র ছেলে পলাশ দিনমজুর।
বয়সের ভারে রোগাক্রান্ত তার মা শোভারানী বলেন, বাবা মারা যাওয়ার কারণে দুই ভাই দ্বিজেন আর বীজেন অনেক আগেই দেশ ছেড়েছেন। অন্য দুই ভাই পীযুষ আর ষড়ানন অভাবের সাথে লড়াই করে কোনমতে টিকে আছেন।
স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছরে স্বজন হারানো এসব অসহায় পরিবারের খোঁজ কেউ রাখেনি। বিড়লা রানী, ঊষা রাণী ও শোভারানীদের একই আর্তনাদ, দেশের জন্য সর্বস্ব হারিয়েও তারা আজ অসহায়। যুদ্ধ না করেও অনেকে মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনা তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। আমাদের মতো গণহত্যার শিকার হয়ে কেউ কেউ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে সরকারি সুবিধা দিচ্ছেন। অথচ বাড়িঘর ও আপনজন হারিয়েও তাদের গ্রামের কারো ভাগ্যে কিছুই জোটেনি। এখনো তারা যুদ্ধ করছেন জীবনের সাথে।
শরণখোলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার এম,আফজাল হোসাইন, এম এ খালেক খান ও যুদ্ধকালীন ইয়ং অফিসার হেমায়েত উদ্দিন বাদশা বলেন, মুক্তিযুদ্ধে লড়াই করে যারা শহীদ হয়েছেন, যে সকল মা বোনেরা সম্ভ্রম হারিয়েছেন তাদের প্রতি যেমন রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা আছে। তেমনি গনহত্যার শিকার হয়ে যারা জীবন দিয়েছেন তাদের অবদান ও স্বীকৃতি পেতে পারে। গণহত্যার শিকার হয়ে প্রান হারানো এ সব মানুষকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে তাদের অসহায় পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা এখন সময়ের দাবি।
৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের দায় বলে অভিমত দিয়েছেন, শরণখোলার রনাঙ্গনের এই বীর যোদ্ধারা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









