সাত মাস বয়সী ফুটফুটে জমজ দুই কন্যা সন্তান রৌশনি ও রাফিজাকে ঘিরে কক্সবাজারের রামু উপজেলার মিঠাছড়ি গ্রামের মরিয়ম বেগমের ঘরে ছিল আনন্দ আর স্বপ্নের আলো। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই আলো নিভে গেল হামের নির্মম থাবায়। ঈদের আনন্দ শেষ হতে না হতেই শোকের মাতমে ভরে ওঠে তাদের পরিবার।
ঈদের পরদিন থেকেই শুরু হয় মরিয়ম বেগম ও তার স্বামী আজিজুল হকের দুই শিশু বাঁচানোর অভিরাম যুদ্ধ ও দৌড়ঝাঁপ। প্রথমে শিশু দুটির কাশি ও জ্বর দেখা দিলে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তারা। এক সপ্তাহ চিকিৎসার পর অবস্থার অবনতি হলে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি করানো হয় কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। ১৩ দিনের মাথায় মারা যায় রৌশনি, আর ঠিক একদিন পর গত ২ এপ্রিল ১৫ দিনের মাথায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে রাফিজা।
শোকাহত বাবা আজিজুল হক বলেন, 'আমরা কোনো চেষ্টা বাদ রাখিনি। কক্সবাজারের প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়েছি, পরে সদর হাসপাতালে ভর্তি করেছি। চট্টগ্রামেও নেওয়ার কথা ভেবেছিলাম, কিন্তু অবস্থার অবনতি হওয়ায় আর সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত দুই মেয়েকেই হারাতে হলো।'
শুধু মরিয়ম বেগমের পরিবারই নয়, একই হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে জেলায় হামে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচে। হাসপাতালের চারপাশজুড়ে এখন শোকাহত মায়েদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. শান্তনু ঘোষ জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ১৫ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৪২ শিশু। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে চার শিশুর মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করা হয়েছে, একটি মৃত্যুর তথ্য এখনো তালিকাভুক্ত হয়নি।
পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা। শিশু ওয়ার্ডে আলাদা হাম ইউনিট মাত্র ৮ সিটের। সেখানে জায়গা সংকোলন না হওয়ায় হামে আক্রান্ত শিশুদের সাধারণ রোগীদের সঙ্গে একই স্থানে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে অন্যান্য শিশুদের মধ্যেও। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন আইসোলেশন ওয়ার্ড চালুর আশ্বাস দিয়েছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, 'হাম এখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সংক্রমণ ঠেকাতে আমরা দ্রুত আইসোলেশন ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছি।'
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শান্তনু ঘোষ বলেন, একটি ডেডিকেটেড হাম ওয়ার্ড করার জন্য আমরা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ২০ বেডের আইসোলশস ওয়ার্ড করার কাজ চলমান রয়েছে। তবে ডাক্তার, নার্স, ক্লিনার এবং কিছু জনবল এবং জিনিসপত্র দরকার সেটির জন্য আমাদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এদিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্যোগ নিয়েছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। রোববার থেকে রামু ও মহেশখালী উপজেলার উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় শুরু হচ্ছে জরুরি হামের টিকাদান কর্মসূচি। পর্যায়ক্রমে জেলার সব উপজেলায় এই কার্যক্রম চালু করা হবে।
ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মহিউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর জানান, দেশের ১৮ জেলার ৩০টি উচ্চ ঝুঁকির এলাকার মধ্যে কক্সবাজারের কয়েকটি ইউনিয়নও রয়েছে। প্রাথমিকভাবে রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ি এবং মহেশখালীর হোয়ানক ও বড় মহেশখালী ইউনিয়নে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে। ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী সব শিশুকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









