বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

যশোরে তীব্র তাপদাহ, বিদ্যুৎ বিপর্যয়

প্রকাশিত: ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৫৭ পিএম

আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৫৭ পিএম

যশোরে তীব্র তাপদাহ, বিদ্যুৎ বিপর্যয়

যশোরে চলমান তীব্র তাপদাহের মধ্যে ভয়াবহ লোডশেডিং জনজীবনকে কার্যত বিপর্যস্ত করে তুলেছে। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের সংকট কয়েকগুণ বেশি হওয়ায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী, রোগী ও নিম্নআয়ের মানুষ। কোথাও কোথাও অধিকাংশ সময়ই বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ উঠেছে। অসহনীয় গরমের মধ্যে বিদ্যুতের এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ভেঙে পড়েছে।

জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে, বিদ্যুৎ বিভাগ, কৃষক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,  জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের ঘাটতি, জ্বালানি সংকট এবং চাহিদা বৃদ্ধির কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, শহরাঞ্চলে তুলনামূলক কম লোডশেডিং হলেও গ্রামের মানুষকে দীর্ঘ সময় অন্ধকারে থাকতে হচ্ছে।

গত কয়েকদিন ধরে যশোরে তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে।

খুলনা আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) দুপুর তিনটায় যশোরে তাপমাত্রা ছিল ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। 

এ অঞ্চলে গরমে মানুষের হাঁসফাঁস অবস্থা। এর মধ্যেই শুরু হয়েছে ঘন ঘন লোডশেডিং। শহরে দিনে চার থেকে পাঁচবার বিদ্যুৎ গেলেও গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন বহু এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। ফলে রাতের ঘুম যেমন হারাম হয়ে গেছে, তেমনি ব্যাহত হচ্ছে কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা।

ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) যশোরের বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১ ও ২ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে যশোর অঞ্চলে বিদ্যুতের মোট চাহিদা প্রায় ১৬৪ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৮৫ থেকে ৯০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ প্রতিদিন অন্তত ৭০ মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি থাকছে। এই ঘাটতি সামাল দিতে বাধ্য হয়েই বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করা হচ্ছে।

ওজোপাডিকো যশোর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাসির উদ্দিন বলেন, “বর্তমানে প্রতিদিন আমাদের চাহিদা প্রায় ৬০ মেগাওয়াট। কিন্তু আমরা পাচ্ছি মাত্র ৪৭ মেগাওয়াট। এই ঘাটতির কারণে লোডশেডিং পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।”

তিনি আরো বলেন, “গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকটের প্রভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। জাতীয় গ্রিড থেকেই আমরা কম বিদ্যুৎ পাচ্ছি।”

শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে সংকটের মাত্রা অনেক বেশি। যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর আওতাধীন শার্শা, বেনাপোল, ঝিকরগাছা ও বাঘারপাড়া এলাকায় সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ -এর জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান বলেন, “সন্ধ্যার পর এ অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ১৬৪ মেগাওয়াট। সেখানে আমরা পাচ্ছি মাত্র ৯০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ প্রায় ৭৪ মেগাওয়াট ঘাটতি রয়েছে।”

অন্যদিকে যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ যার আওতায় রয়েছে মনিরামপুর, কেশবপুর, অভয়নগর, ফুলতলা, নড়াইল সদর, লোহাগড়া ও কালিয়া উপজেলায়ও একই চিত্র। সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মো. হাদিউজ্জামান জানান, চাহিদা ১৬৪ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে সর্বোচ্চ ৮৫ মেগাওয়াট। ফলে গ্রামীণ এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। বর্তমানে বোরো ও ইরি ধানের মৌসুম হওয়ায় সেচের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু বিদ্যুতের অভাবে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

সদরের ডাকাতিয়া গ্রামের কৃষক আমির হোসেন বলেন, “রাতে বিদ্যুৎ থাকে না, দিনে এলেও কিছুক্ষণ পর চলে যায়। এখন পানি না পেলে ধান চিটা হয়ে যাবে।”

সদরের চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের কৃষক আজগর আলী বলেন, “দিনে সেচ দিতে পারি না, রাতে বিদ্যুৎ থাকে না। ডিজেল দিয়ে মেশিন চালাতে গেলে খরচ অনেক বেশি পড়ে। ফসল বাঁচানোই এখন কষ্টকর হয়ে গেছে।”

স্থানীয় কৃষি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে ধান, পাট ও সবজি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব কৃষক পুরোপুরি বৈদ্যুতিক সেচ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

শুধু কৃষি নয়, ক্ষুদ্র শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় গড়ে ওঠা ছোট কারখানা, ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপ, ডেইরি ফার্ম, আইসক্রিম কারখানা ও রাইস মিলগুলোতে উৎপাদন কমে গেছে।

সদরের বোলপুর গ্রামের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা মুরগির ফার্মের মালিক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “দিনে ৮-১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। জেনারেটর চালাতে গেলে খরচ বেড়ে যায়। এখন ব্যবসা চালানোই কঠিন হয়ে গেছে।”

শহরের একটি বরফ কারখানার কর্মচারী সোবহান বলেন, “এই গরমে বরফের চাহিদা অনেক। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন কমে যায়। জেনারেটরে কাজ চালাতে গেলে লাভ থাকে না।”

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে ক্ষুদ্র শিল্প খাতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষা ও পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা চলমান থাকায় শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। 

এসএসসি পরীক্ষার্থী তাবাসসুম খানম বলেন, “রাতে পড়তে বসলে বিদ্যুৎ থাকে না। গরমে ঘুমাতেও পারি না। পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে খুব সমস্যা হচ্ছে।”

পরীক্ষার্থীর বাবা করিম মন্ডল বলেন, “আমার মেয়ে ভালো ছাত্রী। কিন্তু এই অবস্থায় ওর পড়াশোনা নষ্ট হচ্ছে। গ্রামে থাকি বলে বেশি কষ্ট পাচ্ছি।”

রিকশাচালক থেকে শুরু করে দিনমজুর সব শ্রেণির মানুষই এই পরিস্থিতিতে কষ্টে রয়েছেন। শহরের খড়কি এলাকার রিকশাচালক ইব্রাহিম হোসেন বলেন, “রোদে শরীর পুড়ে যাচ্ছে। বাসায় গিয়েও শান্তি নেই। বিদ্যুৎ না থাকলে বাচ্চারা ঘুমাতে পারে না।”

সদরের খিতিবদিয়া এলাকার গৃহিণী সাবিনা আক্তার বলেন, “প্রতিদিন পাঁচ থেকে সাতবার বিদ্যুৎ যায়। একবার গেলে আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত থাকে না। এই গরমে রান্না করা, বাচ্চাদের সামলানো সবকিছু কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”

বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে স্বাস্থ্য খাতেও। গ্রামীণ ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ফার্মেসিগুলোতে বিদ্যুৎ না থাকায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে।

শহরের হাসপাতাল মোড়ের একটি বেসরকারি ক্লিনিকের ম্যানেজার জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকলে অনেক যন্ত্র চালানো যায় না। রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। জেনারেটর দিয়ে সবসময় চালানোও সম্ভব না।”

যশোরের ডেপুটি সিভিল সার্জন নাজমুস সাদিক রাসেল জানান, প্রচণ্ড গরমে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও গরমজনিত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

ফা/য/অই

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.