রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলা-এর দুর্গম পাহাড়ি গ্রামগুলোতে এক নীরব সংকট ধীরে ধীরে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। একসময় যেসব ঝিরি, ঝর্না ও পাহাড়ি ছড়া ছিল স্থানীয় মানুষের জীবনধারণের একমাত্র ভরসা, সেগুলোর অধিকাংশই এখন শুকিয়ে গেছে কিংবা পানির প্রবাহ এতটাই কমে এসেছে যে তা দিয়ে দৈনন্দিন চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে শতাধিক গ্রামে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে পড়েছেন প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ।
স্থানীয় ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার জীবতলী, কচুছড়ি, ৪ কিলো, নোয়া আদাম, মুসলিম ব্লক, প্রশিক্ষণ টিলা বাঙালী পাড়া, সাজেকসহ বিভিন্ন দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এই সংকট সবচেয়ে বেশি প্রকট। যুগ যুগ ধরে এসব এলাকার মানুষ ঝিরি, ঝর্না ও পাহাড়ি ছড়ার পানির ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করে আসলেও বর্তমানে সেসব প্রাকৃতিক উৎসের অধিকাংশই শুকিয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অপরিকল্পিত জুম চাষ এবং নির্বিচারে বন উজাড়ের কারণে পাহাড়ের পানিধারণ ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে ঝিরি-ঝর্নাগুলোর পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে গিয়ে অনেক জায়গায় পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে। আগে বাড়ির পাশেই পানি পাওয়া গেলেও এখন অনেক ক্ষেত্রে দুই থেকে তিন কিলোমিটার এমনকি তারও বেশি পথ পাড়ি দিয়েও পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
সাজেক ইউনিয়নের শিয়ালদাই গ্রামের কারবারি ভুজন ত্রিপুরা ও স্থানীয় বাসিন্দা লক্ষ্মীবালা চাকমা জানান, গত বছর এই সময়েও পানির তেমন সংকট ছিল না। তবে চলতি বছরের মার্চ মাসের শেষ দিক থেকেই পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করে। তাদের মতে, ৮ থেকে ১০ বছর আগেও এসব এলাকায় সারা বছর ছড়ায় পানি পাওয়া যেত, কিন্তু জুম চাষ বৃদ্ধি ও বন উজাড়ের কারণে এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, সাজেক ইউনিয়নের ৮ ও ৯ নম্বর পাড়া, শিয়ালদাই, হাচ্ছেপাড়া, অরুনপাড়া, লংকরসহ বিভিন্ন গ্রামে পানির জন্য হাহাকার বিরাজ করছে। প্রতিটি গ্রামে ৩০ থেকে ৫০টি পরিবারের বসবাস থাকলেও তাদের পানির একমাত্র উৎস ছিল আশপাশের ঝর্না ও ছড়া, যা এখন প্রায় অকার্যকর। ফলে নারী ও শিশুসহ পরিবারের সদস্যদের প্রতিদিন দীর্ঘ পথ হেঁটে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে, যা তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
বিশুদ্ধ পানির অভাবে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে অপরিষ্কার পানি ব্যবহার করায় ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ নানা পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। স্থানীয় এক শিক্ষক জানান, শিক্ষার্থীদের মধ্যেও অসুস্থতার হার বাড়ছে এবং পানির সংকট তাদের শিক্ষাজীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সমতল এলাকা থেকে এক থেকে দুই হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত এসব দুর্গম গ্রামে নলকূপ বা রিংওয়েল স্থাপন করা অত্যন্ত কঠিন। ফলে বাসিন্দাদের একমাত্র নির্ভরতা প্রাকৃতিক পানির উৎসের ওপর, যা বর্তমানে মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অতুলাল চাকমা বলেন, “আগের মতো পাহাড়ি ঝরনায় এখন আর পানি নেই। ফলে পানির সংকট দিন দিন বাড়ছে।” উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী রুশো খিশা জানান, এসব এলাকায় টেকসই পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে বড় ধরনের প্রকল্প ও দাতা সংস্থার সহায়তা প্রয়োজন। তিনি বলেন, “একসময় এসব এলাকায় ঘন বন ছিল। বন উজাড় হয়ে যাওয়ায় পানির স্তর নিচে নেমে গেছে।”
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান বলেন, “অবাধে জুম চাষের নামে বন উজাড় এবং বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় পাহাড়ি এলাকায় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।” তবে স্থানীয়দের মতে, শুধু বৃষ্টির ওপর নির্ভর না করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট সাময়িক নয় বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ও মানবিক সমস্যা। তারা পাহাড়ি এলাকায় গ্র্যাভিটি ফ্লো ওয়াটার সিস্টেম চালু, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নতুন পানির উৎস সৃষ্টি, বন উজাড় রোধ এবং পুনঃবনায়নের ওপর জোর দিয়েছেন।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এই পানি সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে এবং অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে পারে। তাদের দাবি, এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনা, যাতে দুর্গম পাহাড়ি জনপদের মানুষ অন্তত বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা পায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









