বুধবার, ০৬ মে ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

চাচার প্রতারণায় কবরস্থানে রাত কাটছে নিঃস্ব ময়নুলের

প্রকাশিত: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম

আপডেট: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:২৬ পিএম

চাচার প্রতারণায় কবরস্থানে রাত কাটছে নিঃস্ব ময়নুলের

প্রতিবন্ধী ময়নুল ও তার বোন

## ময়নুলের ধূসর বর্তমান
## আপন চাচার জঘন্য প্রতারণা
## ঘর এখন কবরস্থান, সেখানেও মিলছে না নিস্তার
## পাশে দাঁড়িয়েছে স্থানীয়রা
## জনপ্রতিনিধি-প্রশাসনের ভাষ্য 

মানুষের জীবনে বিপর্যয় যখন আসে, তখন আপনজনরাই হয় শেষ আশ্রয়। কিন্তু নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার পূর্ব চিকনমাটি হুজুর পাড়া এলাকার ময়নুলের জীবনে ঘটেছে তার ঠিক উল্টো। যে আপন চাচার ছায়া হয়ে থাকার কথা ছিল, সেই চাচার চরম বিশ্বাসঘাতকতা আর লালসার বলি হয়ে আজ এক সময়ের সচ্ছল ময়নুল যাযাবর, গৃহহীন এবং নিঃস্ব।

ময়নুলের ধূসর বর্তমান: কয়েক বছর আগেও ময়নুলের জীবনটা ছিল এক টুকরো স্নিগ্ধ ছবির মতো। নিজস্ব আবাদি জমি আর প্রিয়তমা স্ত্রী-সন্তান নিয়ে গড়ে তোলা সেই সংসারে ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না। কিন্তু নিয়তি যেন এক নিষ্ঠুর নাটকের চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল। প্রথমে তাঁর মাথার ওপর থেকে সরে গেল বটবৃক্ষের মতো ছায়া দেওয়া জন্মদাত্রী মায়ের আঁচল। মায়ের মৃত্যুর সেই শোকের দাহ কাটতে না কাটতেই তাঁর সাজানো সংসারে লাগে ভাঙন—প্রিয়তমা স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। টানা দু’টি বিয়োগান্তক আঘাত সইবার মতো শক্তি ময়নুলের ছিল না। শোক আর একাকিত্বের পাহাড় মনের ওপর ভেঙে পড়ায় ময়নুল ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেললেন তাঁর মানসিক ভারসাম্য। হাসিখুশি প্রাণবন্ত মানুষটি নিমিষেই সমাজের চোখে হয়ে পড়লেন ‘মানসিক প্রতিবন্ধী’।

আপন চাচার জঘন্য প্রতারণা: ময়নুলের এই ঘোরতর অসহায়ত্ব যেখানে স্বজনদের মনে করুণা জাগানোর কথা ছিল, সেখানে তাঁর আপন চাচা কছির উদ্দিন একে লুফে নিয়েছেন লালসা চরিতার্থ করার অস্ত্র হিসেবে। অভিযোগ উঠেছে, ময়নুল যখন মানসিকভাবে অপ্রকৃতিস্থ, সেই সুযোগে জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে তাঁর বসতভিটাসহ সব জমিজমা নিজের নামে লিখে নেন কছির উদ্দিন।

উল্লেখ্য, কছির উদ্দিন ফায়ার সার্ভিসে বাবুর্চি হিসেবে কর্মরত একজন সরকারি কর্মচারী। একজন সরকারি দায়িত্বশীল পদে থেকে নিজের আপন ভাইয়ের ছেলের ভিটেমাটি কেড়ে নেওয়ার মতো এই জঘন্যতম অপরাধের সংবাদে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। শুধু জমি কেড়ে নিয়েই ক্ষান্ত হননি কছির, ময়নুলকে তাঁর পৈতৃক ভিটা থেকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়ে দখল করে নিয়েছেন সবকিছু।

ঘর এখন কবরস্থান, সেখানেও মিলছে না নিস্তার: সবকিছু হারিয়ে ময়নুলের এখন ঠিকানা হয়েছে স্থানীয় কবরস্থান। এলাকার কিছু সহৃদয় যুবক তাঁর কষ্টের কথা চিন্তা করে সেখানে টিনের চালা ও চাটি দিয়ে একটি অস্থায়ী মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিয়েছিলেন। কিন্তু অমানবিকতার সীমা ছাড়িয়ে সেই ত্যানা-বিছানা এবং চাটিও রাতের আঁধারে লুট করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে কছিরের ছেলে ও সরকারি কৃষি কর্মকর্তা আঃ ছালামের বিরুদ্ধে। বাবার মতো ছেলেও একজন সরকারি কর্মচারী হয়েও যে নিচতা দেখিয়েছেন, তা মানবতার সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

পাশে দাঁড়িয়েছে স্থানীয়রা: ময়নুলের আপনজনরা যখন তাঁকে নিঃস্ব করে ছুঁড়ে ফেলেছে, তখন তাঁর একমাত্র সহায় হয়ে দাঁড়িয়েছে এলাকার সাধারণ মানুষ। বর্তমানে স্থানীয় দুই যুবক সুমন ও মশিয়ারের ব্যক্তিগত উদ্যোগে পলিথিন কিনে ময়নুলের অস্থায়ী ঘরটি ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া এলাকার অনেক সাধারণ মানুষই যে যখন পারছেন, ময়নুলের দিকে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। সমাজের এই সম্মিলিত মানবিকতাই ময়নুলকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে।

চাচা কছিরের ‘বিশাল অট্টালিকা’ নিয়েও প্রশ্ন: ময়নুলের ওপর চলা এই জুলুমের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে ডোমার উপজেলার সচেতন মহল। এলাকাবাসীর দাবি স্পষ্ট—তদন্ত সাপেক্ষে ময়নুলের পৈতৃক সমস্ত সম্পত্তি অবিলম্বে ফিরিয়ে দিতে হবে। অভিযুক্ত কছির ও তার ছেলের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। এলাকাবাসী জোরালো দাবি তুলেছেন যে, সরকারি কর্মচারী হয়ে একজন অসহায় প্রতিবন্ধীর সাথে এমন জঘন্য প্রতারণা করার দায়ে তাদের চাকরিচ্যুত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ এমন দুঃসাহস দেখাতে না পারে।

পাশাপাশি জনমনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে কছিরের সম্পদ নিয়ে। ফায়ার সার্ভিসের একজন সাধারণ বাবুর্চি হয়ে কছির উদ্দিন কীভাবে বিশাল অট্টালিকা ও বিপুল সম্পদের মালিক হলেন, তার উৎস খতিয়ে দেখার জন্য প্রশাসনের কাছে জোর অনুরোধ জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

ময়নুলের বৃদ্ধ বাবা কফিল উদ্দিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাঁর অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমার ছেলের জমি লিখে নিয়েছে অথচ আমি জানিই না। আমার আপন ভাই হয়ে আমার ছেলের জমি এভাবে লিখে নিয়েছে—এটা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। এলাকাবাসীর কাছে আমার বিনীত অনুরোধ, এই জঘন্য কাজের যেন উপযুক্ত বিচার হয়।” একজন বাবার এই হাহাকার আজ হুজুর পাড়ার আকাশ-বাতাসকে ভারী করে তুলেছে।

নিজের ওপর হওয়া এই জঘন্য অবিচার নিয়ে মুখ খুলেছেন স্বয়ং ময়নুল। তিনি বলেন, “আমার চাচা আমাকে জোর করে নিয়ে গিয়ে কিছু কাগজে আমার স্বাক্ষর নেয়। আমি তখন ভালোমতো কিছু বুঝতে পারিনি। এর কিছুদিন পর তারা আমাকে বলে আমার ঘরবাড়ি আর জমিজমাগুলো নাকি তাদের হয়ে গেছে।” একজন ভারসাম্যহীন মানুষকে জোরপূর্বক দলিলে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া যে কত বড় ফৌজদারি অপরাধ, ময়নুলের এই বক্তব্যই তার প্রমাণ।

জনপ্রতিনিধি-প্রশাসনের ভাষ্য: স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মাসুম ও ইউপি সদস্য জাহিনুর ইসলাম সুজন ময়নুলের জমি জবরদখলের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। অত্র এলাকার মসজিদের ইমাম এই কাজকে ‘জঘন্য’ বলে অভিহিত করেছেন। ডোমার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানিয়েছেন, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দ্রুত কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে, অভিযুক্ত কছির ও ছালাম এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ময়নুলের শূন্য দৃষ্টি আজ সমাজের বিবেকবান মানুষের কাছে প্রশ্ন রাখছে—আইন কি পারবে তাকে তার হারানো ভিটা ফিরিয়ে দিতে? উপজেলা প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপই এখন ময়নুলের শেষ ভরসা।

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.