নীলফামারীর ডোমারে এক মানসিক প্রতিবন্ধী ভাতিজাকে প্রতারণার জালে ফেলে তার শেষ সম্বল বসতভিটা লিখে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আপন চাচা কছির উদ্দিনের বিরুদ্ধে। ভিটেমাটি হারিয়ে বর্তমানে বেড়াছাড়া একটি জরাজীর্ণ টিনের চালার নিচে সাপ আর বৃষ্টির সাথে লড়াই করে অমানবিক জীবন কাটাচ্ছেন অসহায় ময়নুল ইসলাম।
ভুক্তভোগী ময়নুল ইসলামের জীবন একসময় অত্যন্ত সাধারণ ছিল। কিন্তু বৈবাহিক জীবনের টানাপোড়েন এবং মায়ের মৃত্যুর শোক সইতে না পেরে তিনি মানসিক ভারসাম্য হয়ে পড়েন। স্থানীয়দের অভিযোগ, ময়নুলের এই চরম অসহায়ত্বকে পুঁজি করে তার আপন চাচা কছির ও তার ছেলে আঃ ছালাম জমি দখলের গভীর ছক আঁকেন। ময়নুলকে সুস্থ করার নাম করে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যত্ন নেওয়ার অভিনয় করেন তারা। এরপর একদিন কৌশলে তাকে ডোমার রেজিস্ট্রি অফিসে নিয়ে টিপসই ও স্বাক্ষরের মাধ্যমে ১০ শতাংশ জমি নিজের নামে লিখিয়ে নেন কছির। জমি হস্তগত করার কিছুদিনের মধ্যেই ময়নুলের দীর্ঘদিনের পুরনো বসতঘরটি ভেঙে দেয় কছির গং।
ঘর ভেঙে দেওয়ার পর ময়নুল বর্তমানে একটি জরাজীর্ণ টিনের চালার নিচে আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু অমানবিকতার এখানেই শেষ নয়; অভিযোগ উঠেছে, কছির উদ্দিন ও তার ছেলেরা সেই চালার নিচে থাকা সামান্য চাটি এবং বিছানাপত্রও কেড়ে নিয়ে গেছে। বর্তমানে চালার কোনো বেড়া না থাকায় ঝড়-বৃষ্টির পানি সরাসরি ময়নুলের শরীরে পড়ছে। কাদাপানিতে ভিজে একাকার হয়ে সেই চালার নিচেই মানবেতর রাত কাটাতে হচ্ছে তাকে।
প্রতিবেশী সাইদুল ইসলাম আতঙ্কিত কণ্ঠে জানান, "গত রাতে আমি ময়নুলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখেছি তার শরীরের ওপর দিয়ে একটি বিষধর সাপ চলে যাচ্ছে। একজন মানুষের এমন করুণ দশা দেখার মতো নয়।" স্থানীয় যুবকরা পলিথিন দিয়ে তাকে রক্ষার চেষ্টা করলেও বিরূপ আবহাওয়ার কারণে তা কাজে আসছে না।
জালিয়াতির বিষয়টি ময়নুলের বাবা কফিল উদ্দিন জানতে পেরে মামলা দায়ের করেছিলেন। তবে অভাবের তাড়না এবং ময়নুলের মানসিক অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে চতুর কছির আদালতে কৌশলে জয়ী হন। ময়নুল মানসিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় আদালতে উপস্থিত হতে না পারার সুযোগ নিয়ে কছির একতরফা রায় হাতিয়ে নেন বলে জানা গেছে।
এই জালিয়াতির ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলে সম্প্রতি এক শালিস বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অভিযুক্ত কছির উদ্দিন প্রতারণার বিষয়টি স্বীকার করেন। এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য জাহিনুর ও ইউপি চেয়ারম্যান মাসুম বলেন, "ময়নুলের অধিকার ফিরিয়ে দিতে আমরা নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। শালিস বৈঠকে প্রতারণার মাধ্যমে লিখে নেওয়া জমির মধ্যে তিন শতক জমি ফেরত দিতে চেয়েছিলেন কছির। কিন্তু ১৫ দিন পার হয়ে গেলেও তিনি এখনো সেই জমি ফেরত দেননি, বরং নানাভাবে টালবাহানা করছে বলে জানতে পেরেছি।"
এলাকাবাসীর দাবি, সরকারি পদে আসীন ব্যক্তিদের কাছ থেকে সমাজ এমন অমানবিক আচরণ প্রত্যাশা করে না। কছির উদ্দিন ফায়ার সার্ভিসের বাবুর্চি এবং তার ছেলে আঃ ছালাম একজন কৃষি কর্মকর্তা। সরকারি চাকুরে হয়েও একজন অসহায় প্রতিবন্ধীর সাথে এমন জঘন্য জালিয়াতি করায় তারা অবিলম্বে বাবা-ছেলের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণসহ তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতির দাবি জানিয়েছেন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বিষয়টি অবগত হয়ে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
অভিযুক্ত কছির ও ছালামের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্ঠা করলেও তারা এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এলাকাবাসী এখন প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপের অপেক্ষায় আছে, যাতে ময়নুল তার ভিটেমাটি ফিরে পায় এবং দোষীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









