অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে ও পরবর্তী সময় পেরিয়ে এখনও সরগরম ঝিনাইদহ-১ (শৈলকুপা) আসন। ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর মূল আলোচনা আবর্তিত হচ্ছে ৫টি বিশেষ ইস্যুকে কেন্দ্র করে। ৫টির মধ্যে রয়েছে গড়াই নদীর ভাঙন, কৃষি হিমাগার, বেকারত্ব দূরীকরণ, মাদক ও সামাজিক সহিংসতা। তবে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা নিরসনে সাধারণ মানুষের প্রধান দাবি মাদক ও সামাজিক সহিংসতামুক্ত একটি নিরাপদ জনপদ। জনগণের এই দাবির মুখে প্রার্থীরাও তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘শান্ত ও সন্ত্রাসমুক্ত শৈলকুপা’ গড়ার অঙ্গীকারকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
শৈলকুপার হিতামপুর পেঁয়াজচাষী আব্দুল মান্নান হোসন বলেন, ‘নেতারা ভোটের মাঠে এসে বলেছে কোল্ড স্টোরেজ বানিয়ে দেবে, কিন্তু ভোট শেষে কেউ কথা রাখে না।’ প্রথমবারের ভোটার বিপুল বিশ্বস বলেন, ‘আমরা মারামারি আর মাদক চাই না। আমরা চাই কর্মসংস্থান আর শান্তিপূর্ণ শৈলকুপা।’ উপজেলার বিষ্ণুদিয়া এলাকার রহিমা বেগম বলেন, ‘সামাজিক দলাদলির ভয়ে পুরুষরা শান্তিতে ঘরে থাকতে পারে না। আমরা এমন এমপি চাই যে এলাকার দাঙ্গা চিরতরে বন্ধ করবে।’ গড়াই নদীপাড়ের বাসিন্দা মোমেনা খাতুন বলেন, ‘আমরা প্রতিবছর গড়াই নদীর ভাঙনে নিঃস্ব হচ্ছি। রাতে ভয়ে ঘুমাতে পারিনা। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য ভোটের সময় সবাই শুধু আশ্বাস দেয় কিন্তু কাজের কাজ হয়না।'
শৈলকুপার বাগুটিয়া জরিপ বিশ্বাস ডিগ্রি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সুব্রত মল্লিক বলেন, ‘শৈলকুপায় সামাজিক সমস্যা প্রকট। রাজনৈতিক শক্তির চেয়ে এখানে সামাজিক শক্তির প্রাধান্য বেশী। সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের সাথে-সাথে সামাজিকভাবে যাদের প্রভাব বেশী তাদের সাথে মিলে যায়। সামাজিক বিভিন্ন কারণে এখানকার মানুষ সহিংসতায় লিপ্ত হয়। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এখানকার মানুষ হানাহানিতে লিপ্ত হয়। সামাজিক সচেতনতা তৈরি করতে না পারলে সন্ত্রাস মোকাবেলা সম্ভব না। সেক্ষেত্রে নির্বাচিত প্রতিনিধিকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে না পারলে সন্ত্রাস মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না। আর মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হলে পারিবারিক, সামাজিক সচেতনতার বিকল্প নেই। তরুণ ও যুব সমাজকে কর্মমূখী করে গড়ে তুলতে পারলেই কেবল মাদকের ভয়াল ছোবল থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সন্ত্রাস, মাদকের ভয়াবহতা থেকে যুবসমাজকে ফিরিয়ে আনতে হলে দরকার সাংস্কৃতিক চর্চার সুষ্ঠু পরিবেশ। যুব সমাজ খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং কর্মমূখী হলে এমনিতেই সন্ত্রাস এবং মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে উঠবে।’
ঝিনাইদহ-১ (শৈলকুপা) আসনটি ১টি পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। উপজেলাটি রাজনৈতিক ও সামাজিক দলাদলির জন্য পরিচিত। বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে সামাজিক ও রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৩০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে নির্বাচনী মাঠের প্রধান ইস্যু হলো সামাজিক দলাদলি ও সহিংসতা বন্ধ করা। তবে নির্বাচনের পরেও লাঠিয়াল সংস্কৃতি ও সামাজিক সংঘাত বন্ধ হয়নি। সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ার সুযোগে এ উপজেলায় মাদকের বিস্তার রয়েছে। তরুণ প্রজন্মকে এই মরণব্যাধি থেকে বাঁচাতে প্রার্থীরা তাদের ইশতেহারে মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছেনা। গড়াই নদীর তীর ঘেঁষা এ উপজেলার সারুটিয়া ও হাকিমপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীর ভাঙনে প্রতিবছর বিলীন হয়। ফলে শত শত মানুষ ভিটেমাটি হারায়। একটি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি থাকলেও দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে তা বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ নদী তীরবর্তী বসবাস মানুষের।
শৈলকুপার এনসিপি নেতা সুপ্রিম কোর্টের বিজ্ঞ অ্যাড. লাবাবুল বাসার দয়াল বলেন, 'নদী ভাঙন রোধে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং আধুনিক ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে পানির প্রবাহ ঠিক রাখার প্রতিশ্রুতির দ্রুত বাস্তবায়নের কোন ভূমিকা দৃশ্যত নেই। শৈলকুপা উপজেলা একটি কৃষিপ্রধান অঞ্চল হলেও এখানে পর্যাপ্ত হিমাগার নেই, ফলে কৃষকরা ফসলের ন্যায্য দাম পান না। পেঁয়াজ ও রসুন চাষীদের দীর্ঘদিনের দাবি একটি সরকারি কৃষি হিমাগার।'
শৈলকুপায় শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থান বিষয়ে এই আসনের তরুণদের মাঝে প্রধান উদ্বেগ রয়েছে। এলাকাবাসীদের অভিযোগ, 'বিগত সময়ে এই আসন থেকে যারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তারা শুধু প্রতিশ্রুতিইে সীমাবদ্ধ ছিলেন। যোগাযোগ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে কাজ হলেও মাদক, বেকারত্ব, নদীভাঙন, কুমার নদের নাব্যতা সংকট রোধ, কৃষি খাত, সামাজিক ও রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধে কোনো যুগান্তকারী মাইলফলক স্পর্শ করেনি এই এলাকা।'


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









