বগুড়ার যমুনা তীরের পলিমাটিতে এবার ফলছে মরুর রত্ন আঙুর। অসম্ভবকে সম্ভব করে সারিয়াকান্দির দক্ষিণ জোড়গাছা গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা আবু নাসের কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছেন। যে মাটিতে একসময় কেবল ধান আর পাটের আধিপত্য ছিল, আজ সেখানে থোকায় থোকায় ঝুলছে বিদেশি জাতের সুমিষ্ট আঙুর।
আবু নাসেরের এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহার। প্রথাগত শিক্ষার বাইরে তিনি ইউটিউবকে ব্যবহার করেছেন কৃষি গবেষণার হাতিয়ার হিসেবে। ইন্টারনেটে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আঙুর চাষের কলাকৌশল দেখে তিনি উদ্বুদ্ধ হন। এরপর নিজের ১৬ শতাংশ জমিতে গড়ে তোলেন স্বপ্নের এই বাগান। আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছাশক্তি থাকলে হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনটিও কৃষিতে বিপ্লব আনতে পারে।
নাসেরের বাগানে এখন রঙের মেলা। সেখানে মূলত চারটি বিশ্বখ্যাত জাতের চাষ হচ্ছে, যা সাধারণত বাংলাদেশে দেখা যায় না। যারা দীর্ঘাকৃতি এবং নজরকাড়া রঙের আঙুর পছন্দ করেন, তাদের জন্য বাইকোনুর ও একোলো সিলভা এই জাত দুটি বিস্ময়কর। আবার যারা বীজহীন এবং প্রচণ্ড মিষ্টি আঙুর খুঁজছেন, তাদের চাহিদাপূরণে ক্রিমসন ও জয় এই দুই জাত অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
বাংলাদেশে আঙুর চাষ নিয়ে বড় ভয় ছিল এর স্বাদ। দীর্ঘদিনের ধারণা ছিলÑআবহাওয়ার কারণে এ দেশের আঙুর টক হবে। কিন্তু নাসেরের বাগান সেই সংস্কার ভেঙে দিয়েছে। প্রখর রোদ আর সঠিক আর্দ্রতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি এমন আঙুর ফলিয়েছেন যা স্বাদে আমদানিকৃত আঙুরের চেয়েও মিষ্টি এবং ঘ্রাণে অতুলনীয়। ১৬ শতাংশ জমিতে সবুজ, লাল ও কালো রঙের আঙুরের এই সমারোহ এখন এলাকার পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
আবু নাসের এখন আর কেবল একজন সফল উদ্যোক্তা নন, তিনি কৃষি রূপান্তরের পথপ্রদর্শক। তার এই সাফল্য দেখে স্থানীয় কৃষি বিভাগে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। নাসের মনে করেন, সরকার যদি প্রশিক্ষণ ও উন্নত জাতের চারা সরবরাহ করে, তবে বাংলাদেশের প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় আঙুর চাষ করা সম্ভব।
তরুণ এই উদ্যোক্তা বলেন, আমি চেয়েছিলাম এমন কিছু করতে যা অন্যদের অনুপ্রেরণা দেবে। আমাদের দেশের আবহাওয়া এখন আর বিদেশি ফল চাষে বাধা নয়, বরং সুযোগ। ১৬ শতাংশ জমি দিয়ে শুরু করেছি, ভবিষ্যতে এর পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে।
সারিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, এই ফসলটা সারিয়াকান্দিতে নতুন। এবছর যেহেতু পরীক্ষামূলক ভাবে চাষ করা হয়েছে, এখন দেখতে হবে সারিয়াকান্দির মাটি আঙুর চাষের জন্য কতটা উপযোগী। কৃষি অফিস থেকে যদি কারিগরি সহায়তার প্রয়োজন হয়, তার ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়াও যদি কখনও সারিয়াকান্দিতে আঙুরের প্রদর্শনী আসে, তরুণ এই উদ্যোক্তাকে সুযোগ দেওয়া হবে।
বগুড়ার সারিয়াকান্দির এই ‘আঙুর বিপ্লব’ এখন কেবল একটি বাগান নয়, বরং বেকার তরুণদের জন্য একটি জীবন্ত পাঠশালা। নাসেরের হাত ধরে এভাবেই স্মার্ট বাংলাদেশের স্মার্ট কৃষি এগিয়ে যাবে এমনটাই প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









