কবি রজনীকান্ত সেনের বিখ্যাত কবিতা “স্বাধীনতার সুখ”-এ বাবুই পাখির আত্মমর্যাদার যে চিত্র উঠে এসেছে, বাস্তবের বাংলাতেও তেমনই দৃষ্টিনন্দন ছিল বাবুই পাখির বাসা। গ্রামগঞ্জের উঁচু তালগাছে ঝুলে থাকা এসব শৈল্পিক বাসা আর পাখির কিচির-মিচির শব্দ ছিল প্রকৃতির এক অপূর্ব সৌন্দর্য। তবে সময়ের পরিবর্তন, পরিবেশগত বিপর্যয় এবং তালগাছ কমে যাওয়ায় এখন সেই দৃশ্য ক্রমেই হারিয়ে যেতে বসেছে।
সারা দেশের মতো চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজার জেলাতেও কমছে তালগাছের সংখ্যা। এর প্রভাব পড়েছে বাবুই পাখির আবাসস্থলে। আশ্রয় সংকটে পড়ে বাবুই পাখিরা এখন বাধ্য হয়ে নারিকেল গাছে বাসা তৈরি করছে।
জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভাড়াউড়া চা বাগান এবং রাজনগর উপজেলার হলদিগুল গ্রামে দেখা গেছে নারিকেল গাছে অসংখ্য বাবুই পাখির বাসা। এসব দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন স্থানীয় ও দূর-দূরান্তের মানুষ।
ভাড়াউড়া চা বাগানের শ্রমিক সমিরণ হাজরা বলেন, “আমাদের বাসার সামনে থাকা নারিকেল গাছে কয়েক বছর ধরে বাবুই পাখিরা বাসা তৈরি করছে। আমরা এমনভাবে নারিকেল সংগ্রহ করি যাতে পাখিদের কোনো ক্ষতি না হয়। অনেকেই এখানে এসে পাখি ও তাদের বাসা দেখে ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন।”
অন্যদিকে রাজনগরের কৃষক মো. আইয়ুব আলী বলেন, “এ বছর প্রথমবার আমার বাড়ির নারিকেল গাছে ১১টি বাসা হয়েছিল। তবে ঝড়-তুফানে কিছু বাসা পড়ে গেছে। তবুও প্রতিদিন মানুষ এগুলো দেখতে আসেন।”
প্রবীণ শিক্ষাবিদ সুবিনয় পাল বলেন, “একসময় প্রায় প্রতিটি গ্রামে তালগাছে বাবুই পাখির বাসা দেখা যেত। এখন তালগাছও কমে গেছে, পাখিও কমেছে। শুধু বাবুই নয়, অনেক দেশীয় পাখিই হারিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।”
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহমুদ আলী বলেন, “তালগাছই বাবুই পাখির প্রধান আশ্রয়স্থল। তালগাছ কমে যাওয়ায় তারা নারিকেল গাছে বাসা বাঁধছে। বাবুই পাখি টিকিয়ে রাখতে হলে ব্যাপক হারে তালগাছ রোপণ করতে হবে, নতুবা ভবিষ্যতে এ পাখি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে দেশি বাবুই, দাগি বাবুই ও বাংলা বাবুই—এই তিন ধরনের বাবুই পাখি দেখা যায়। অত্যন্ত পরিশ্রমী এই পাখি খড়, কচিপাতা ও লতাপাতা দিয়ে নিখুঁতভাবে বাসা তৈরি করে, যা দেখতে অনেকটা উল্টানো কলসির মতো। তাদের এই শৈল্পিক দক্ষতার কারণে বাবুই পাখিকে ‘প্রকৃতির ইঞ্জিনিয়ার’ও বলা হয়।
পরিবেশবিদরা বলছেন, বাবুই পাখি রক্ষায় তালগাছ রোপণ, প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। তা না হলে অচিরেই বাংলার প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যেতে পারে এই শিল্পী পাখি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









