উত্তরাঞ্চলের কৃষিপ্রধান রংপুর বিভাগে বাণিজ্যিকভাবে মৎস্য চাষে নীরব বিপ্লব ঘটলেও পানি সংকটের কারণে চাহিদার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। রংপুর অঞ্চলের প্রায় পৌনে দুই লাখ পুকুর বর্তমানে তীব্র পানি সংকটে ভুগছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় বাজার ও আমিষের চাহিদায়। মৎস্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলে বছরে মাছের চাহিদা ৩ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন হলেও উৎপাদন হচ্ছে ৩ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন। ফলে প্রতি বছর প্রায় ১৯ হাজার মেট্রিক টন মাছের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
রংপুর মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ অঞ্চলে মোট ২ লাখ ৮০ হাজার পুকুর থাকলেও তার মধ্যে ১ লাখ ৭০ হাজার পুকুরই পানিশূন্যতার কারণে যথাযথভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে অক্টোবর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত দীর্ঘ সাত মাস অধিকাংশ পুকুর শুকিয়ে যাওয়ায় মাছ চাষ পুরোপুরি বন্ধ থাকে। মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র পাঁচ মাস চাষাবাদ চললেও তা চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত। এই সংকট সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলায়। এই তিন জেলার প্রায় ৮০ শতাংশ পুকুর বছরের দীর্ঘ সময় পানিশূন্য থাকে, যা মৎস্য খাতের বিকাশে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভৌগোলিক তথ্য অনুযায়ী, রংপুর অঞ্চলে ৫০টি নদ-নদী, ১ হাজার ২০০ খাল এবং ৮৩৭টি বিল থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত অবক্ষয়ের কারণে এসব জলাশয়ে স্থায়ী পানির পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ার ফলে এ অঞ্চলের প্রায় ২০০ প্রজাতির দেশীয় মাছের মধ্যে ইতোমধ্যে ৩০টি প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। ফলে একদিকে যেমন চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ দেশি মাছের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বর্তমান হিসেবে এ অঞ্চলের প্রায় দেড় কোটি মানুষের মাথাপিছু বার্ষিক ২২ কেজি মাছের চাহিদা মেটানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রংপুর মৎস্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মঞ্জুরুল ইসলাম জানান, এই সংকট মোকাবিলায় মৎস্য বিভাগ নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে দেশি প্রজাতির মাছ রক্ষায় এ অঞ্চলের ৫৮টি উপজেলায় অভয়াশ্রম তৈরির মাধ্যমে মাছের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে প্রতিকূল আবহাওয়ায় মাছ চাষে চাষিদের উন্নত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে এই ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য জলাশয় খনন ও পানির স্থায়ী উৎস নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









