ঝিনাইদহের ১২ নদ-নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনা ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে সাধারণ মানুষের উত্থাপিত দাবির প্রেক্ষিতে নির্বাচনী ওয়াদা করেছেন জেলার ৪টি সংসদীয় আসনের এমপি প্রার্থীরা। নদ-নদীগুলো দখলমুক্ত করে হারানো যৌবন ফিরিয়ে দিতে জাতীয় সংসদের নির্বাচিত এমপিদের পক্ষ থেকে ‘দৃশ্যমান পদক্ষেপ’ দেখতে মুখিয়ে আছে পুরো জেলাবাসী।
এ জেলার ৬ টি উপজেলাজুড়ে নদনদী, খাল, বিল, বাঁওড় ও খাস জলাশয়গুলোতে সরেজমিনে দেখা গেছে, দখলদারিত্বের রামরাজত্ব রাম চলছে। ঝিনাইদহের মানচিত্র দিয়ে বয়ে যাওয়া নবগঙ্গা, কুমার ও চিত্রাসহ ১২টি নদ-নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে। কোথাও প্রভাবশালীদের ঘর-বাড়ি আর কোথাও ফসলি জমিতে রূপ নিয়েছে একসময়ের প্রবলভাবে বহমান ও বিশালাকারের এসব স্রোতধারার নদনদী এখন মৃতপ্রায় বিগত যৌবনা। দীর্ঘদিনের দখল আর দূষণে নদীগুলো এখন মৃত সরু নালায় পরিণত হয়েছে।
সর্বশেষ অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন প্রার্থীদের মুখে এবারে নদী রক্ষার নানা প্রতিশ্রুতি শোনা গেছে। এমপি প্রার্থীরা বলেছেন, নির্বাচিত হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নদী খনন ও নাব্য ফিরিয়ে আনা হবে। তবে ঝিনাইদহের সাধারণ নাগরিকের দাবি, 'কেবল আশ্বাস নয় এবার নদী দখলমুক্ত করার বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে।'
ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মোট ১২টি নদ-নদী আছে। এ সব নদীর মধ্যে রয়েছে ঝিনাইদহ-হরিণাকুণ্ডু এলাকায় বেগবতি ও নবগঙ্গা, শৈলকুপায় কুমার, গড়াই, কালীগঙ্গা, মহেশপুরে বেতনা, ইছামতি ও কোদলা, কোটচাঁদপুরে কপোতাক্ষ নদ এবং ঝিনাইদহ-কালীগঞ্জে ফটকি, চিত্রা ও বেগবতি। এসব নদ-নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০৩ কিলোমিটার। ঝিনাইদহ সদর ও কোটচাঁদপুর উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া চিত্রা নদীর অবস্থা খুবই করুণ। নদীর বুকে মানুষ চাষাবাদ শুরু করেছে বহুকাল আগেই। নদীপাড়ের মানুষ ইচ্ছামতো মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। কোটচাঁদপুরের তালসার, ইকড়া গ্রাম, সদর উপজেলার গান্না, জিয়ানগর, কালীগঞ্জ শহরের পুরাতন বাজার, বলিদাপাড়া, হেলাই, নিমতলা ও ফয়লা এলাকায় চিত্রা নদী দখল করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর তৈরি করা হয়েছে। কাগজে-কলমে চিত্রা নদীর প্রস্থ দেখানো হয়েছে ৮০ মিটার এবং গভীরতা ৫ মিটার। তবে দূষণ, দখল আর ভরাটে এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। চিত্রা নদী দখল মুক্ত করতে ২০২৩ সালে তালিকা তৈরী করা হলেও প্রভাবশালীদের বাঁধার কারণে হয়নি।
শৈলকুপার একসময়ের খরস্রােতা গড়াই ও কুমার নদ পানির অভাবে (বর্ষাকাল ব্যতীত) শুকিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। দেখে বোঝার উপায় নেই এখানে একসময় বিশাল নদ-নদী ছিল। নদীর কোথায় হাটুপানি, আবার কোথাও বুকপানি। বেশিরভাগ স্থানে খননের অভাবে পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। সেই ভরাট নদীর বুকে চলছে চাষাবাদ। এখন নদ-নদীর বুকে শুধুই ফসলের ক্ষেত আর মাঝ দিয়ে চুঁইয়ে যায় পানিপ্রবাহ। শুষ্ক মৌসুমে নদীর বুকে চাষাবাদ করা হয়। শৈলকুপার কুমার নদটি চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার মাথাভাঙ্গা নদী থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। ১৩০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের কুমার নদের পানির প্রধান উৎস ছিল মাথাভাঙ্গা। চুয়াডাঙ্গার হাটবোয়ালিয়া এলাকায় নদের উৎসমুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপরও কুমার নদ কালীগঙ্গা, ডাকুয়া ও সাগরখালী নদীর মাধ্যমে পানি প্রবাহ পেত। কিন্তু জিকে সেচ প্রকল্প বাস্তবায়নকালে এ দুটি নদীর উৎসমুখও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ঝিনাইদহ শহরের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নবগঙ্গা নদী বেশিরভাগ কচুরিপানায় পরিপূর্ণ থাকে। নদীপাড়ে গড়ে উঠেছে দোকান ও বাড়ি। ঝিনাইদহ পৌরসভার প্রধান ড্রেন পড়েছে নবগঙ্গা নদীতে। ফলে আবর্জনা ও বজ্র পড়ছে নদীতে। প্রবাহ না থাকায় এতে দুর্গন্ধময় হয়ে পড়েছে নদীর পানি। মহেশপুরের কোদালা নদী এখন চেনার উপায় নেই। ২৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য নদীর বুকে অসংখ্য পুকুর খনন করা হয়েছে। গড়ে উঠেছে বাড়িঘর। প্রায় ৩০ বছর ধরে নদীপাড়ের মানুষ আস্ত একটা নদী গিলে খাচ্ছে, অথচ কারো বাথাব্যাথা নেই। একই ভাবে ফটকী, বেতনা, বেগবতী, ভৈরব ও কালীগঙ্গা নদী মরাখালে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে প্রখভাবশালীদের দখলের কারণে নদীর চিহ্ন বিলীন হতে চলেছে। মহেশপুর ও কোটচাঁদপুর উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত কপোতাক্ষ নদ দখল করে মাছ চাষ করা হয়। বিক্রি হয় নদীর মাটি।
এক সময় ঝিনাইদহের নবগঙ্গা নদীতে প্রচুর ঝিনুক পাওয়া যেত। সেই সূত্র ধরে ঝিনাইদহ নামকরণের সাথে প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের সমাহারও যুক্ত রয়েছে। ফার্সি ভাষায় ‘দহ’ শব্দের অর্থ গ্রাম, বাংলায় ‘দহ’ বড় জলাশয় বা জলাধার অর্থে সবমিলিয়ে জলের গ্রাম- ঝিনাইদহ অনবদ্য এক জলাভূমি। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নিন্মমুখী পানির স্তর ও দুষ্প্রাপ্যতার সাথে নদনদী, বাঁওড়, বিল, ঝিল, খাল, দোহা, দিঘী, পুকুর ও জলাধারে ভরপুর ঝিনাইদহ জেলাও পানির নিন্মস্তর ও দুষ্প্রাপ্যতা বিবেচনায় বিশেষ ক্ষরাপ্রবণ অঞ্চল হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। জলাধারগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পানিতে দূষিত হয়ে পড়েছে। দূষণ আর দখলদারিত্বের কাছে ক্রমাগত এখন জলশূণ্য হচ্ছে জলাশয়গুলো।
বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া, বাংলাদেশ হাওড় ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট ও সংশ্লিষ্ট জেলা তথ্য বাতায়ন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে সর্বমোট এ জেলায় বর্তমানে ৮৩টি জলমহাল রয়েছে, যার আয়তন-৯৪৫৭.৫০ হেক্টর। হাল নাগাদ খাস খতিয়ানভুক্ত জলমহালের মধ্যে ঝিনাইদহ জেলায় নদ-নদী ১২, বাঁওড় ২২, বিল ২৫, ১২ পুকুর,খাল ৫ ও দোহা ৫ টি উল্লেখ থাকলেও সিএস রেকর্ড হিসাব করলে কয়েকগুণ সংখ্যা বেড়ে অনেক বর্ধিত তালিকাভুক্ত হবে। জেলাটির ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ১২টি প্রমত্তা নদীতে পাওয়া যেত নানা জাতের মাছ; চলাচল করতো বড়-বড় নৌকা। যার সূত্র ধরে নদী পাড়ে গড়ে উঠেছিল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে দখল আর দূষণে এসব নদী অস্তিত্ব সংকটে। কোথাও প্রভাবশালীদের ঘর-বাড়ি, আবার কোথাও চলছে কৃষিকাজ। নদীতে থেকে অবৈধভাবে মাটি ও বালি উত্তোলন করে রমরমা ব্যবসার প্রসারও ঘটেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার প্রার্থীরা উন্নয়নের নানা বুলি দিলেও নদী রক্ষা প্রশ্নে তারা কতটা আন্তরিক, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন জনসাধারণ ও পরিবেশ কর্মীরা। ঝিনাইদহে নদীর গুরুত্ব ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের অংশ হিসাবে বিক্ষোভ, মিছিল, মানববন্ধন ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হলেও কর্তৃপক্ষ বরাবরই এ ব্যাপারে উদাসীন থাকেন।
বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল, কোটচাঁদপুর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান শান্তি বলেন, 'আমাদের জেলার ১২টি নদ-নদী, নবগঙ্গা, চিত্রা, কুমার, বেগবতী ও কপোতাক্ষসহ সবই আজ অস্তিত্ব সংকটে। প্রভাবশালীরা নদীর বুক দখল করে ঘরবাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তুলছে। কোথাও কোথাও নদী এতটাই সংকুচিত যে চেনার উপায় নেই। অথচ এই নদীগুলোই ছিল আমাদের কৃষির প্রাণ আর মাছের উৎস।’ তিনি বলেন, ‘আমরা আর ফাঁকা প্রতিশ্রুতি শুনতে চাই না। আমাদের দাবি পরিষ্কার সিএস ম্যাপ অনুযায়ী নদীগুলোর সীমানা নির্ধারণ করে সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পুনঃখনন করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। শহরের বর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধ করতে হবে। জনপ্রতিনিধিদের মনে রাখতে হবে নদী বাঁচলে ঝিনাইদহ জেলা বাঁচবে। আমরা চাই প্রশাসন এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সমন্বিতভাবে কাজের মাধ্যমে আমাদের এই বারোটি নদ-নদী ও জলমহালগুলোকে আবারও দখল-দূষণমুক্ত করে প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ সুরক্ষা বলয় গড়ে তুলুক।'


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









