বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

শৈলকুপায় মসজিদের মধ্যেই অন্য রকম আকৃতির দুই কবর

প্রকাশিত: ১২ মে ২০২৬, ১২:০৮ পিএম

আপডেট: ১২ মে ২০২৬, ১২:০৮ পিএম

শৈলকুপায় মসজিদের মধ্যেই অন্য রকম আকৃতির দুই কবর

১০ বিঘা জমির চারপাশে বেষ্টনি। ভিতরে একটি মসজিদ, কবর, পুকুর ও বিভিন্ন গাছপালা-জঙ্গলেঘেরা। এরমধ্যে মসজিদের ভিতরেই দেখা মিলবে অস্বাভাবিক আকৃতির দুটি কবর। কবর দুটি আধ্যাত্মিক ফকির বাউল শাহ ও তার প্রধান শিষ্য জমির শাহের। জনশ্রুতি আছে, কবর দুটি প্রতিবছর ঘুরছে আর এর আকৃতি বর্তমানে সোজা না থেকে বাঁকা হয়ে আছে। এটি ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার নাগপাড়া গ্রামের বাউল শাহ্ ফকিরের মাজারের ঘটনা।

মাজারের মসজিদটির নাম নাগপাড়া মোকাম বাড়ি নূর-ই জামে মসজিদ। পাশেই আরেকটি কবরে শায়িত আছেন আধ্যাত্মিক ফকির বাউল শাহের শিষ্য আজিম শাহ। এই মাজারে মানত করলে পূরণ হয় মনোবাসনা। মাজারে ধর্ম-বর্ণ-দল-মত নির্বিশেষে নিয়ত রেখে বিভিন্ন পশু কোরবানি ও দান-খয়রাতসহ ফল-ফসলাদি ভক্ত-অনুরাগীরা দিয়ে থাকে। একসময় আধ্যাত্মিক ফকির বাউল শাহের ইশারায় এই স্থানটিতে ঘটতো নানা অলৌকিক ঘটনা।

জানা গেছে, প্রায় ৫০০ বছর আগে পাবনা জেলা থেকে নাগপাড়া গ্রামের মনিরুদ্দিন মন্ডলের বাড়িতে গোচারণের রাখাল হিসেবে নিয়োজিত হন বাউল শাহ ফকির। সেসময় গরু-ছাগলকে অপরের ফসল না খেয়ে শুধু ঘাস খাওয়ানো, ফণা তোলা বিষধর গোখরা সাপের সঙ্গে শয়নরত কক্ষে থাকতেনও তিনি। এছাড়া সেই আমলে একবার প্রচণ্ড খরায় বৃষ্টির অভাবে মানুষ ফসলে বুনতে বিপাকে পড়লে বাউল শাহ ফকির ক্ষেতের মাঠে গিয়ে একটানা কয়েকদিন অনাহারে ধ্যানমগ্ন সিজদায় গেলে বৃষ্টিপাত ঘটে। এসব অলৌকিক ঘটনা দেখে এলাকাবাসী বাউল শাহকে রাখাল হিসেবে থাকতে নিষেধ করলে তিনি নাগপাড়া গ্রামের রায় বাড়ির জঙ্গলে ঘেরা জমিতে আস্থানা গড়ে তোলে। এরপর থেকেইে বাড়তে থাকে তার ভক্ত। পরে জমির মালিক রায় বংশের গৃহকর্তা সাতকড়ি চন্দ্র রায় তৎকালীন পাট্রা দলিলে বাউল শাহ ফকিরকে জমিদান করেন।

কথিত আছে, বিনা অনুমতিতে মোকাম বাড়ির মাজারের কোনো সম্পদ গ্রহণ করতে কেউ পারেনি, কেউ চুরি করে কলা নিলে সিদ্ধ হয়নি, মাছ চুরি করতে এসে জাল ফেলে রাত থেকে সকাল পর্যন্ত পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা, পুকুরে গজার মাছের ঝাঁক, কলেরা ও বসন্তের মহামারী প্রাদুর্ভাব রোধ করে গ্রাম বন্ধে তদবির, ফসলের পোকামাকড় ও রোগবালাই মুক্তি, পানিপড়া, তেলপড়া ও ঝাড়ফুঁকে দুরারোগ্য ব্যাধি নিরাময়ে বাউল শাহ ফকিরের কেরামতিতে অনুগত মুরিদ ও জমিদার প্রধানসহ ভক্তকুল আস্থানার উন্নতির জমিজমা ও ফসলাদি দান-ছতকা করেছেন। বাউল ফকির প্রাপ্ত দান-ছতকা থেকে ইমারত, পুকুর খনন, মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। ফকিরের আস্তানার নাম হয় মোকাম বাড়ি। মোকাম বাড়িতে ফকিরের বাসভবন, বৈঠকখানাসহ প্রাচীন স্থাপনা, কারুকার্যমণ্ডিত অট্টালিকা ৬টি ভবন এখন আর অবশিষ্ট নেই।

স্থানীয়রা বলছেন, বেশ কিছু বছর আগে গ্রামবাসী সিদ্ধান্ত নিয়ে পুরাতন ভবনগুলো ভেঙে মসজিদ তৈরি করেছে। প্রাচীন মসজিদের সূত্র ধরে নতুন মসজিদের বারান্দায় বাউল শাহ ও তার প্রধান শিষ্য জমির শাহের কবর রয়েছে। তবে কবরদুটি ঘূর্ণায়মান আকৃতির রূপ নিয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। ফকির বাউল শাহের মাজার মসজিদের ইমাম আব্দুল আলীম বলেন, বাউল শাহের মাজারের এই মসজিদে প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে। মসজিদের মক্তবে সকাল ও বিকালে এলাকার শতাধিক ছেলে-মেয়েকে কোরআন শিক্ষা দেওয়া হয়। 

ঝিনাইদহের শৈলকুপায় এই মসজিদের ভেতরে রহস্যময় আকৃতির কবরে শায়িত বাউল শাহ ফকিরের নামে কয়েকগ্রামে বিস্তৃত সর্বমোট ১২.৮৪ এক জমি ওয়াকফ তালিকায় গেলেও যৎসামান্য আঙিনা ঘিরে জেলার শৈলকুপা উপজেলা নাগপাড়া গ্রামে আনুমানিক ৫০০ বছর পূর্বের এ সুফি সাধকের কেরামতির গল্প আজও মানুষ বিশ্বাস করে। তার মোকাম বাড়ি মাজারে ধর্ম-বর্ণ-দল-মত নির্বিশেষে নিয়ত রেখে বিভিন্ন পশু কোরবানি ও দান-খয়রাতসহ বিভিন্ন ফল-ফসলাদি ভক্ত-অনুরাগীরা দিয়ে থাকে।স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, বাপ-দাদার মুখে শোনা যে ঘন জঙ্গল বেষ্টিত নির্জন স্থানে স্রষ্টার সাধনায় ভাবোন্মত্ত বাউল শাহ ফকিরের নানা অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন।

ঐতিহাসিক সতীশ চন্দ্র মিত্র রচিত ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ নামক পুস্তকে ১৮০০ শতকের প্রথম দশকের মধ্যে বাউল শাহ ফকিরের কার্যকাল উল্লেখ করা হয়েছে।  নাগপাড়া গ্রামের বনেদি রায় বংশের গৃহকর্তা সাতকড়ি চন্দ্র রায় তৎকালীন পাট্রা দলিলে বাউল শাহ ফকিরকে জমিদান করেন। তার পূর্বেই বাউল শাহ সেই ঘন জঙ্গলের ঘেরা জমি আস্থানা গেড়েছিলেন।  প্রধান শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম জমির শাহ ফকির ও আজিম শাহ ফকিরের কবরস্থান বাউল শাহ ফকিরের করবের পাশাপাশি সংরক্ষিত রয়েছে। আধ্যাত্মিক ফকির বাউল শাহের জন্ম ও মৃত্যুর সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বর্তমানে এই ফকিরের মোকামবাড়ি, মসজিদসহ সম্পত্তি ওয়াকফ স্টেটভুক্ত হলেও সরকারিভাবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জমি, গাছপালাসহ যাবতীয় সম্পদ তসরুফের অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, এই আধ্যাত্মিক ফকিরের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালনা ও তদারকি করা জরুরি।

সু/ঝি/কাও

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.