বিশ্বরাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রু বলে কিছু নেই—স্থায়ী থাকে কেবল জাতীয় স্বার্থ। সেই বাস্তবতাকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে দীর্ঘদিনের বৈরী দুই দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক। কয়েক দশকের উত্তেজনা, নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হুমকি এবং প্রক্সি সংঘাতের পর দুই দেশ যখন আলোচনার টেবিলে বসে সমঝোতার পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তা শুধু একটি কূটনৈতিক ঘটনা নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতার নতুন সম্ভাবনারও ইঙ্গিত বহন করে। যদিও এই সমঝোতা স্থায়ী সমাধানের নিশ্চয়তা দেয় না, তবুও যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান আশঙ্কার মধ্যে এটি স্বস্তির বার্তা হয়ে এসেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।
মধ্যপ্রাচ্য গত কয়েক দশক ধরেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে অস্থিতিশীল ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধ কেবল দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর প্রভাব বিস্তৃত হয়েছে জ্বালানি বাজার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক কূটনীতির ওপর। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই উত্তেজনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, অনেক বিশ্লেষক বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা।
চুক্তির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, এটি সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতায় শক্তির প্রদর্শন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, অনেক সময় তার চেয়েও বেশি কার্যকর হয় সমঝোতার সক্ষমতা। ইতিহাস দেখিয়েছে, সামরিক শক্তি দিয়ে যুদ্ধ শুরু করা সহজ হলেও তার রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শুরু করে আফগানিস্তান পর্যন্ত বিভিন্ন অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে, পরাশক্তির সামরিক সক্ষমতা সবসময় রাজনৈতিক সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। এই চুক্তি সেই বাস্তবতাকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র অনেক এগিয়ে থাকলেও ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব, অসম যুদ্ধকৌশল এবং কৌশলগত অবস্থান ওয়াশিংটনকে আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য করেছে। এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—ক্ষমতার ভারসাম্য কেবল অস্ত্রের সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; কৌশল, ভূগোল, রাজনৈতিক ধৈর্য এবং জনমতও সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
চুক্তির অর্থনৈতিক দিকটিও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই প্রণালী উন্মুক্ত হওয়ার অর্থ শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, বরং সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা। একইভাবে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে এবং মূল্য অস্থিরতা কিছুটা হলেও কমতে পারে। তবে এই সমঝোতাকে অতিরিক্ত আশাবাদের চোখে দেখারও সুযোগ নেই। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অবিশ্বাসের ইতিহাস দীর্ঘ এবং গভীর। অতীতেও বিভিন্ন সময় আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তন, আঞ্চলিক স্বার্থের সংঘাত এবং পারস্পরিক সন্দেহের কারণে সেসব উদ্যোগ স্থায়ী ফল দেয়নি। বর্তমান চুক্তিও মূলত একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা, যার সফলতা নির্ভর করবে আগামী ৬০ দিনের আলোচনার ওপর।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আঞ্চলিক অংশীজনদের ভূমিকা। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে কোনো দ্বিপক্ষীয় চুক্তি কখনও পুরোপুরি দ্বিপক্ষীয় থাকে না। ইসরাইল, উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো, লেবানন, সিরিয়া এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির অবস্থানও এই চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে চলমান সামরিক অভিযান বন্ধ হওয়ার প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিলের ঘোষণাও একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য। কেবল যুদ্ধবিরতি নয়, মানুষের জীবনে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমেই প্রকৃত শান্তির ভিত্তি তৈরি হয়।
পরিশেষে বলা যায়, এই সমঝোতা স্মারক শান্তির চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; বরং শান্তির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিরতি। এটি এমন এক চুক্তি, যা বিশ্বাসের ভিত্তিতে নয়, বরং অবিশ্বাসের বাস্তবতা মেনে নেওয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অনেক সময় এ ধরনের চুক্তিই বড় সংঘাত প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকর উপায় হয়ে ওঠে। তাই এই উদ্যোগকে স্বাগত জানানো উচিত, তবে একই সঙ্গে বাস্তববাদী সতর্কতাও বজায় রাখতে হবে।
শান্তি তখনই টেকসই হবে, যখন স্বাক্ষরিত কাগজের প্রতিশ্রুতি বাস্তব রাজনৈতিক আচরণে প্রতিফলিত হবে। আপাতত বলা যায়, যুদ্ধের অনিশ্চয়তার চেয়ে কূটনীতির এই সম্ভাবনা বিশ্বের জন্য অনেক বেশি আশাব্যঞ্জক।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









