আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। নির্বাচনী অঙ্গীকার হিসেবে এটি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সেই লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত? কারণ কর্মসংস্থান কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি বিনিয়োগ, উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বাভাবিক ফল। আর বিনিয়োগের চাকা যখন ধীরগতিতে ঘুরছে, তখন কর্মসংস্থানের বিশাল লক্ষ্য কতটা অর্জনযোগ্য, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে বিনিয়োগ বৃদ্ধির নানা পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। বন্ধ কারখানা চালু, প্রণোদনা প্যাকেজ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ—সবই ইতিবাচক। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় সমস্যা পরিকল্পনার অভাব নয়, বাস্তবায়নের দুর্বলতা। বছরের পর বছর ধরে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির কথা বলা হলেও ব্যবসায়ীরা এখনো একই সমস্যার মুখোমুখি—আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দীর্ঘসূত্রিতা, নীতির অস্থিরতা এবং সর্বোপরি দুর্নীতি। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বারবার একটি কথাই বলছেন—তারা নীতির ধারাবাহিকতা চান। এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
কারণ কোনো বিনিয়োগকারী এমন দেশে অর্থ বিনিয়োগ করতে চান না, যেখানে নিয়মকানুন হঠাৎ বদলে যেতে পারে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব থাকে কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বিনিয়োগকারীদের এই উদ্বেগ নতুন নয়; বহু বছর ধরে তারা একই অভিযোগ করে আসছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এখনো সেই সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান হয়নি? বাংলাদেশে ব্যবসা করতে গিয়ে একজন উদ্যোক্তাকে অসংখ্য দপ্তরের দ্বারস্থ হতে হয়। একটি লাইসেন্স, একটি অনুমোদন বা একটি সংযোগ পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। ডিজিটালাইজেশন ও ব্যবসা সহজীকরণের বহু প্রচারণা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে পরিবর্তন সীমিত। ফলে অনেক সম্ভাব্য বিনিয়োগ শুরু হওয়ার আগেই নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশে আগে থেকে বিনিয়োগ করা কিছু বিদেশি প্রতিষ্ঠানও তাদের কার্যক্রম সংকুচিত করছে কিংবা অন্য দেশে স্থানান্তরের কথা ভাবছে।
অর্থনীতির আরেকটি বড় সংকট হলো জ্বালানি ও অবকাঠামোগত অনিশ্চয়তা। শিল্পকারখানার জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন। অথচ একদিকে জ্বালানির দাম বাড়ছে, অন্যদিকে সরবরাহ পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল নয়। বিনিয়োগকারীদের কাছে এটি একটি নেতিবাচক বার্তা দেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। সাধারণ মানুষের আয় বাড়ছে না, কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাজারে চাহিদা কমে গেলে শিল্প উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হয়।
অর্থাৎ বিনিয়োগ, উৎপাদন ও ভোগ—অর্থনীতির তিনটি প্রধান স্তম্ভই বর্তমানে চাপের মধ্যে রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেশের অর্থনীতি যখন বিনিয়োগ সংকটে ভুগছে, তখন বিদেশি ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের আমানত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থ এক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এই তথ্য কেবল অর্থ পাচারের আশঙ্কাই উসকে দেয় না, বরং দেশীয় অর্থনৈতিক পরিবেশ সম্পর্কে এক ধরনের অনাস্থারও ইঙ্গিত বহন করে। দেশের ভেতরে বিনিয়োগের সুযোগ ও নিরাপত্তা নিয়ে যদি আস্থা থাকত, তাহলে দেশীয় মূলধনের একটি অংশ বিদেশে আশ্রয় খুঁজত না।
সরকার জিডিপির ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ বিনিয়োগ অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। লক্ষ্য নির্ধারণ সহজ, কিন্তু তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন কঠিন সিদ্ধান্ত। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, নীতির ধারাবাহিকতা, করব্যবস্থার সংস্কার এবং ব্যবসা সহজীকরণে বাস্তব অগ্রগতি ছাড়া বিনিয়োগ বাড়বে না। শুধু প্রণোদনা ঘোষণা বা নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন অর্থের অভাব নয়, আস্থার অভাব। বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা এবং সুশাসনের নিশ্চয়তা খুঁজছেন। সরকার যদি এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আর যদি সত্যিই এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হয়, তাহলে প্রথমেই দুর্নীতি, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









