প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনার সঙ্গে শুধু একটি প্রাণই ঝরে যায় না; নিভে যায় একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি জাতির সম্ভাবনা। অথচ বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ সড়ক এখনও অধরাই রয়ে গেছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের (আরএসএফ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন সেই নির্মম বাস্তবতাকেই আবারও সামনে এনেছে। ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে সাত বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৭ হাজার ৩৬৪ জন শিক্ষার্থী। এই সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়; প্রায় প্রতিদিনই গড়ে তিনজন শিক্ষার্থীর জীবন ঝরে গেছে। এটি হাজারো স্বপ্নভঙ্গ, অসংখ্য পরিবারের অপূরণীয় শোক এবং রাষ্ট্রের জন্য এক গভীর ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, নিহতদের বড় অংশই স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ছোট শিশুরা স্কুলে যাওয়া-আসার পথে কিংবা বাড়ির আশপাশে খেলতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছে। অন্যদিকে তরুণরা মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি নিহত হচ্ছে। অনিরাপদ যানবাহন, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক, বেপরোয়া গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং দুর্বল আইন প্রয়োগ- এসব কারণ বহুদিন ধরেই জানা। তারপরও কার্যকর সমাধান না হওয়া নিঃসন্দেহে দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহির প্রশ্ন তোলে। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দুই শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর দেশজুড়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তা জাতিকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিল। সে সময় নানা প্রতিশ্রুতি, নতুন আইন এবং কঠোর পদক্ষেপের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আজ আট বছর পরও বাস্তবতা বলছে, সেই প্রতিশ্রুতির বড় অংশই বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। দুর্ঘটনা কমেনি; বরং শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হয়েছে। ফলে প্রশ্ন জাগে- আমরা কি কেবল আরেকটি দুর্ঘটনার অপেক্ষায় থাকি, তারপর কয়েক দিনের জন্য সরব হই, এরপর আবার সব ভুলে যাই?
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ নয়; এটি সরকার, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব। শিক্ষার্থীদের ট্রাফিক আইন সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে নিরাপদ অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের মোটরসাইকেল চালানো কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে ফিটনেসবিহীন যানবাহন, বেপরোয়া চালক এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া চলবে না। আইন যদি সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ না হয়, তবে দুর্ঘটনা কমানোর সব উদ্যোগই ব্যর্থ হবে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, সড়ক পরিবহন খাতে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি এবং প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর আধিপত্য আজও নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা। দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন, সুপারিশ প্রণয়ন কিংবা আশ্বাস দেওয়ার সংস্কৃতি বহুবার দেখা গেছে; কিন্তু বাস্তবে পরিবর্তন খুব কমই ঘটেছে। ফলে মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ণ হয়েছে এবং নিরাপদ সড়কের দাবি বারবার উপেক্ষিত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা নিরাপদে বিদ্যালয়, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারবে- এটি কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, বরং তাদের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সর্বোপরি জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু মানে শুধু একটি প্রাণের অবসান নয়; এটি একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের মৃত্যু। তাই আর বিলম্ব নয়, আর আশ্বাস নয়। নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় এখনই কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ, প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবন অমূল্য, আর তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কর্তব্য।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









