আগুন কোনো হাসপাতালের জন্য শুধু একটি দুর্ঘটনার ঝুঁকি নয়; এটি মুহূর্তের মধ্যে অসংখ্য অসহায় রোগী, স্বজন এবং স্বাস্থ্যকর্মীর জীবনকে বিপন্ন করে তুলতে পারে। যে প্রতিষ্ঠান মানুষের জীবন রক্ষার শেষ আশ্রয়, সেই হাসপাতালই যদি অগ্নিনিরাপত্তাহীন থাকে, তবে তা একটি প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা নয়; বরং রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার গুরুতর দুর্বলতার পরিচায়ক।
অথচ বাস্তবতা হলো, ফায়ার সার্ভিসের সর্বশেষ পরিদর্শনে দেশের প্রায় ৪৮ শতাংশ হাসপাতাল ও ক্লিনিককে অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আরো উদ্বেগের বিষয়, এই তালিকায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি হাসপাতালগুলোর নামও রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন হাজারো মানুষের জীবন রক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের নিরাপত্তাই আজ প্রশ্নবিদ্ধ।
গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ধারাবাহিকভাবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ইউনাইটেড হাসপাতালে আগুনে করোনা রোগীর মৃত্যু, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে প্রাণহানি কিংবা শিশু হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ড- এসব ঘটনা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে, হাসপাতালগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা কতটা নাজুক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে প্রতিটি দুর্ঘটনার পর কিছুদিন আলোচনা হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি আবারও বিস্মৃতির আড়ালে চলে যায়। ফলে শিক্ষা গ্রহণের পরিবর্তে আমরা যেন পরবর্তী দুর্ঘটনার অপেক্ষায় থাকি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ফায়ার সার্ভিস নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে ঝুঁকির বিষয়গুলো চিহ্নিত করে, নোটিশ দেয়, এমনকি প্রয়োজন হলে জরিমানাও করে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সেই সতর্কবার্তার কার্যকর প্রতিফলন দেখা যায় না। বছরের পর বছর একই ধরনের ত্রুটি বহাল থাকে। এটি শুধু অবহেলা নয়; বরং মানুষের জীবনকে জেনেশুনে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়ার শামিল। নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেও যদি হাসপাতাল পরিচালনার সুযোগ থাকে, তবে প্রয়োজনীয় সংস্কারে কোনো প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ সৃষ্টি হওয়ারও কথা নয়।
হাসপাতালকে কখনোই সাধারণ ভবনের সঙ্গে এক কাতারে বিবেচনা করা যায় না। এখানে থাকে আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, অক্সিজেন ও মেডিকেল গ্যাসের লাইন, উচ্চক্ষমতার বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি এবং এমন অসংখ্য রোগী, যাদের অনেকেই নিজের পায়ে হেঁটে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সক্ষমতা রাখেন না। ফলে, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই হাসপাতাল নির্মাণের নকশা, বৈদ্যুতিক অবকাঠামো, জরুরি নির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, ধোঁয়া শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এবং নিয়মিত অগ্নিনির্বাপণ মহড়াকে বিলাসিতা নয়, বরং বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঝুঁকির বিষয়টি স্বীকার করেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার অজুহাতে একইভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ‘বিকল্প ব্যবস্থা নেই’- এই যুক্তি কোনোভাবেই রোগীর জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে রাখার বৈধতা দিতে পারে না। রোগীর নিরাপত্তার চেয়ে বড় কোনো প্রশাসনিক বা আর্থিক অজুহাত হতে পারে না। প্রয়োজন হলে ধাপে ধাপে সংস্কার, বিকল্প ভবনে স্থানান্তর অথবা নতুন অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে ঝুঁকি দূর করতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালের লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তা সনদকে কঠোরভাবে বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং এ বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া যাবে না।
স্বাস্থ্যসেবা শুধু চিকিৎসা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; নিরাপদ পরিবেশে চিকিৎসা নিশ্চিত করাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাসপাতালে আগুনে একজন রোগীর মৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি আমাদের পরিকল্পনা, তদারকি ও জবাবদিহির ব্যর্থতার নির্মম প্রতিফলন। তাই আর কোনো হাসপাতাল যেন আগুনের ফাঁদে পরিণত না হয়, সে দায়িত্ব সরকার, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের। কারণ, মানুষ যেখানে জীবন বাঁচানোর আশায় আসে, সেই স্থান কখনোই নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক হতে পারে না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









