দেশজুড়ে তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট। রাজধানী ঢাকায় পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হলেও ঢাকার বাইরে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কোথাও ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা, কোথাও তারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। কোনো কোনো এলাকায় ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগও রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে- রাজধানীকে স্বস্তি দিতে গিয়ে কি গ্রামের মানুষকে অতিরিক্ত দুর্ভোগের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে?
বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে গ্যাসের ঘাটতি, এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন এবং প্রচণ্ড দাবদাহকে সামনে আনা হচ্ছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজিবাহী জাহাজ টার্মিনালে ভিড়তে না পারায় গ্যাস সরবরাহ কমেছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান বেড়ে গিয়ে লোডশেডিং ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কিন্তু এ সংকট শুধু সাময়িক আবহাওয়াজনিত নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের জ্বালানি পরিকল্পনার দুর্বলতা ও আমদানি নির্ভরতার ঝুঁকি।
জাতীয় গ্রিডে কয়েক হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ভুগছে পল্লী এলাকার মানুষ। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ বিদ্যুৎ গ্রাহক পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন। অথচ লোডশেডিংয়ের বড় বোঝা তাদের ওপর পড়ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় কৃষিকাজ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, শিল্প, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। তীব্র গরমে শিশু ও বয়স্কদের দুর্ভোগ আরো বাড়ছে। বিদ্যুৎনির্ভর একটি অর্থনীতিতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকা শুধু ভোগান্তি নয়, এটি মানুষের আয় ও উৎপাদনশীলতার ওপর সরাসরি আঘাত।
রাজধানীতে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বিবেচনায় বিদ্যুৎ সরবরাহে কিছু অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেই অগ্রাধিকার যদি গ্রামাঞ্চলে অসহনীয় লোডশেডিং সৃষ্টি করে, তাহলে তা ন্যায্যতার প্রশ্ন তোলে। ঢাকার স্বস্তি যেন গ্রামীণ মানুষের দুর্ভোগ আড়াল করার হাতিয়ার না হয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সব অঞ্চলের নাগরিকের জন্য ন্যায্য ও নির্ভরযোগ্য সেবা নিশ্চিত করা।
পরিস্থিতির আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো জনঅসন্তোষের বিস্ফোরণ। বিদ্যুৎ না পেয়ে বিভিন্ন এলাকায় পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে হামলা, ভাঙচুর এবং কর্মীদের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটছে। গ্রাহকদের ক্ষোভের কারণ বাস্তব হলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হামলা কোনো সমাধান নয়। মাঠপর্যায়ের কর্মীরা নীতিনির্ধারক নন। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রাহকদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও করতে হবে।
গ্যাস সংকটও একইভাবে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করছে। বাসাবাড়িতে রান্না বন্ধ, সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন এবং শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একটি বা দুটি এলএনজি টার্মিনালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, বর্তমান পরিস্থিতি তা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে। বৈরী আবহাওয়ায় একটি জাহাজ টার্মিনালে ভিড়তে না পারলেই যদি জাতীয় পর্যায়ে বড় সংকট তৈরি হয়, তবে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। সরকারকে তাই তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় যেতে হবে।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির বৈচিত্র্য আনা এবং সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অপচয় ও অযৌক্তিক ব্যয় কমিয়ে দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, লোডশেডিংয়ের ক্ষেত্রে বৈষম্য কমানো। কত ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে, কখন থাকবে না- এ বিষয়ে মানুষকে বাস্তবসম্মত তথ্য দিতে হবে। পূর্বঘোষিত লোডশেডিং সূচি থাকলে মানুষ অন্তত নিজেদের কাজের পরিকল্পনা করতে পারবে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস কোনো বিলাসপণ্য নয়; এগুলো মানুষের জীবন ও অর্থনীতির মৌলিক প্রয়োজন। রাজধানীকে কিছুটা স্বস্তিতে রেখে দেশের বিশাল গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘ সময় অন্ধকারে রাখা কোনো টেকসই নীতি হতে পারে না। ঢাকার ‘সান্ত্বনা’ দিয়ে গ্রামের যন্ত্রণা ঢেকে নয়, বরং রাজধানী ও প্রান্ত- উভয় এলাকার মানুষের জন্য সমানভাবে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিশ্চিত করাই এখন সরকারের প্রধান দায়িত্ব।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









