যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন বা বর্তমানে করছেন তাদের কাছে সেশনজট একটি অতিপরিচিত শব্দ। দেশের ছোট-বড়, পাবলিক-প্রাইভেট সব বিশ্ববিদ্যালয়েই কমবেশি সেশনজট লেগেই থাকে। ছাত্রজীবনকে বলা হয় সোনালি সময়, অথচ আমাদের এই সোনালি সময় কেটে যায় সেশনজটের পিছনে দৌড়াতে দৌড়াতে।
সেশনজট বলতে বোঝায় মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিক্ষাক্রম শেষ করতে না পারা বা বিলম্ব হওয়া। যেমন- আপনার কোর্স যদি ৪ বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকে, ওটা ৪ বছরে শেষ না হয়ে ৫-৬ বছরে শেষ হওয়া।
পরীক্ষার ফল প্রকাশে বিলম্ব, নতুন সেমিস্টার দেরীতে শুরু হওয়া, শিক্ষকের অভাব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক দুর্বলতা বা ব্যর্থতা, দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সেশনজট হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে দেখা যায়, রাজনৈতিক বা প্রাকৃতিক কারণে সেশনজট হয়, যেমন- করোনা ভাইরাস। একবার সেশনজট তৈরি হলে ওটা কাটিয়ে উঠতে পারলেও, আবার সেশনজট লেগে যায়। যার মূল কারণ হলো আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক দুর্বলতা বা ব্যর্থতা।
বাংলাদেশে প্রাইভেট বা পাবলিক দুই ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়েই সেশনজট রয়েছে। কিন্তু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট পাবলিক থেকে অনেক কম। ব্যানবেইস-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট হারে ৪০ দশমিক একান্ন এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রিশ দশমিক ত্রিশ দশমিক চৌষট্টি থাকার উল্লেখ আছে।
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে মূলত শিক্ষকদের অভাবে সেশনজট হয়ে থাকে, তবুও দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেশনজট কমানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করে। বেশিরভাগ সময়ে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ক্লাস বা পরীক্ষা নিয়ে তারা সেশনজট কমিয়ে থাকে। সেশনজটের দিক থেকে বিচার করলে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু দেশের সকল স্টুডেন্টের অতোটা সামর্থ্য নেই যে তারা প্রাইভেটে পড়াশোনা করবে। প্রাইভেটে পড়াশোনার গ্যাপ যেমন কম, তেমনি এটা ভীষণ ব্যয়বহুল।
তাই আমাদের দেশে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার শেষ ভরসা পাবলিক বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু এই পাবলিক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট যেন শিক্ষাথীদের পড়াশোনার সবচেয়ে বড় বাধা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজটের পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক জটিলতা।
পরীক্ষার ফলাফল সময়মতো প্রকাশ না করা এবং পরবর্তী সেমিস্টারের ক্লাস শুরু হতে দেরি হওয়া সেশনজটের অন্যতম কারণ। উদাহরণস্বরূপ, গত বছর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৪-২৫ সেশনের শিক্ষার্থীদের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল ফ্রেব্রুয়ারিতে দিলেও ক্লাস শুরু হতে অনেক বিলম্ব দেখা যায়। আবার তৃতীয় বর্ষের একটি ফলাফল ৮ মাসেও প্রকাশিত হয়নি।
শিক্ষক ও প্রশাসনিক ঘাটতি, অবকাঠামো না থাকার কারণেও প্রায় সময় সেশনজট হয়। যেমন-শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি অনুষদে প্রায় সময় শিক্ষক ও পরীক্ষার জায়গা না থাকার কারনণ নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা হয় না। এই সেশনজটগুলো প্রশাসনের কারণে হলেও এর ভুক্তভোগী শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের হতে হয়। এই সেশনজটের ফলে শিক্ষার্থীরা শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক, ও কর্মসংস্থানসহ সকল ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হয়।
সেশনজটের দীর্ঘ বিরতির ফলে শিক্ষার্থীদের পূর্ববর্তী বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা কমে যায়। শেষে শিক্ষার্থীদের কাছে ডিগ্রি থাকে ঠিকই কিন্তু চাকরি করার মতো দক্ষতা থাকে না।
অপরদিকে যারা বিদেশে গিয়ে গবেষণা করতে চায় তারাও ফান্ড পায় না। আবার, যারা দেশে সরকারি চাকরি করতে চায়, কখনো কখনো দেখা যায়, অতিরিক্ত সেশনজটের ফলে তারা চাকরিপ্রার্থী হিসেবে বাতিল হয়ে যায় বয়স বেড়ে যাওয়ার কারণে। অথচ এখানে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব কোনো দোষই নেই।
শিক্ষা জটিলতার ফলে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়ে, যা তাদের অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। কখনো কখনো তারা নিজেকে পরিবার ও সমাজের বোঝা মনে করে আত্মহত্যার দিকেও ধাবিত হয়। অনেক আবার ডিপ্রেশনের ফলে মাদকাসক্ত হয়ে যায়।
সেশনজটের কারণ শিক্ষার্থীদের জীবনের সুন্দর সময়ের অপচয় তো হয়-ই, সেই সাথে আমাদের দেশে শিক্ষার মানও ভঙ্গুর হয়ে যায়। যার ফলস্বরূপ দেখা যায়, বেকারত্ব আর বিশ্বে শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ১০০০+ অবস্থানে। এই অবস্থার পরিবর্তন করতে সরকার এবং দেশের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জরুরি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
লেখক: শিক্ষার্থী


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









