ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশে ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রাকৃতিক দুর্যোগের রূপও পরিবর্তিত হয়। সাধারণত প্রতিবছর জুন থেকে আগস্ট মাসে এ দেশের ওপর দিয়ে বঙ্গোপসাগর থেকে তীব্র জলীয় বাষ্পপূর্ণ শক্তিশালী মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয়। এর প্রভাবে দেশজুড়ে টানা অতিবৃষ্টি এবং সক্রিয় বৃষ্টিবলয় সৃষ্টি হয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে এই অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারে না। ফলে দেশের নিম্নাঞ্চলসহ প্রধান শহরগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়, যা জনজীবনকে সম্পূর্ণ স্থবির করে দেয়।
মৌসুমি এই অতিবৃষ্টি এবং জলাবদ্ধতা শুধু মানুষের যাতায়াত বা অর্থনৈতিক কার্যক্রমই ব্যাহত করে না, বরং তা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক ও বহুমুখী ঝুঁকি তৈরি করে। বৃষ্টির সময় ও পরবর্তী সময়ে মূলত দুই ধরনের স্বাস্থ্যবিপর্যয় দেখা দেয়- পানিবাহিত রোগ ও মশাবাহিত রোগ। জলাবদ্ধতার কারণে নোংরা নর্দমা, খোলা টয়লেট এবং ড্রেনের পচা উচ্ছিষ্ট জল সুপেয় পানির লাইনে মিশ্রিত হয়ে যায়। এই দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়, টাইফয়েড ও জন্ডিসের মতো মারাত্মক পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। এর পাশাপাশি দীর্ঘ সময় দূষিতপানিতে চলাফেরা করার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ, ছত্রাক সংক্রমণ এবং পায়ে ঘা হওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায়।
অন্যদিকে, বৃষ্টির পানির আরেকটি বড় অভিশাপ হলো মশাবাহিত রোগ, বিশেষ করে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার প্রকোপ। বৃষ্টির পরিষ্কার পানি যখন বিভিন্ন পরিত্যক্ত পাত্র, টায়ার, ডাবের খোসা, ছাদ কিংবা ফুলের টবে জমে থাকে, তখন তা এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য একদম উপযুক্ত অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। এডিস মশা এই জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে ডিম পাড়ে এবং মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে তা থেকে নতুন মশার জন্ম হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ডেঙ্গুর চরিত্রগত পরিবর্তন ঘটেছে, যা বর্ষা মৌসুমে দ্রুত ডেঙ্গু সংক্রমণকে মহামারি পর্যায়ে নিয়ে যায়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা শক সিন্ড্রোমের কারণে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতাজনিত এই ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে বাঁচতে হলে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি আমাদের প্রত্যেক নাগরিককে ব্যক্তিগতভাবে সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে।
পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে প্রথম শর্ত হলো শতভাগ নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা। এই সময়ে যে কোনো উৎস থেকে সংগৃহীত পানি অন্তত ২০ মিনিট ফুটিয়ে কিংবা পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করে পান করতে হবে। রান্নাবান্না ও গৃহস্থালি কাজেও নিরাপদ পানি ব্যবহার করা শ্রেয়। ঘরবাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় যথাসম্ভব নোংরা ও পচাপানি মাড়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে এবং প্রয়োজনে গামবুট ব্যবহার করা যেতে পারে।
মশাবাহিত ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রধান হাতিয়ার হলো মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করা। ঘরের ভেতর কিংবা চারপাশে কোথাও যেন টানা তিনদিনের বেশি পানি জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত মশক নিধক স্প্রে, অ্যারোসল বা কয়েল ব্যবহার করার পাশাপাশি ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। শিশুদের সুরক্ষায় ফুলহাতা পোশাক পরিধান করানো এবং মশা তাড়ানোর লোশন ব্যবহার করা জরুরি। সর্বোপরি, এই সময়ে যে কোনো ধরনের জ্বর বা পেটের অসুখ হলে নিজে নিজে ওষুধ না খেয়ে দ্রুত নিকটস্থ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সম্মিলিত সচেতনতাই পারে বর্ষার এই স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা করতে।
লেখক: শিক্ষার্থী


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









