নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা সরকারের অন্যতম বড় দায়িত্ব। বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যখন ক্রমাগত বাড়ছে, তখন চাল, ডাল, তেল, চিনি, গম, পেঁয়াজ, রসুনসহ মৌলিক খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। চলতি অর্থবছরের বাজেটে প্রায় ৬০টি নিত্যপণ্যের আমদানিতে উৎসে কর ও অগ্রিম আয়কর কমানোর সিদ্ধান্ত ছিল এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ। এর ফলে জুনের শেষার্ধ ও জুলাইয়ে পাইকারি বাজারে কিছুটা স্বস্তিও দেখা গিয়েছিল। কিন্তু আগস্টের শুরুতেই সেই স্বস্তি উবে গিয়ে আবারও বাড়ছে ভোগ্যপণ্যের দাম। এ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
পাইকারি বাজারে পাম অয়েল, সয়াবিন, চিনি, গম, ছোলা, ডাল, পেঁয়াজ, রসুন ও মসলার দাম বৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ—দুই ধরনের কারণই রয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের তীব্রতা, কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে শস্য রপ্তানির অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার অস্থিরতা আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে গমের আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যেই দেশের আটা-ময়দার বাজারে পড়েছে। এক মাসের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের আটা-ময়দার দাম ৪ থেকে ৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে—যা ভোক্তার জন্য সরাসরি অতিরিক্ত ব্যয়।
তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে দায়ী করে বাজারের সব ধরনের মূল্যবৃদ্ধিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই। একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যে পণ্য আমদানি করে দেশে পৌঁছাতে কয়েক মাস সময় লাগে, আন্তর্জাতিক বাজারে সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির খবর প্রকাশের পরপরই দেশের বাজারে তার দাম কেন বেড়ে যায়? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমদানিকারক, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতা—প্রতিটি স্তরের মূল্য নির্ধারণব্যবস্থা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অগ্রিম আয়কর কমানোর উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসায়ীদের আর্থিক চাপ কমিয়ে পণ্যের দাম সহনীয় রাখা। কিন্তু সেই সুবিধা ভোক্তার কাছে কতটা পৌঁছেছে, তার কার্যকর নজরদারি জরুরি। কর কমানোর সুফল যদি কেবল ব্যবসায়ীদের মুনাফা বাড়ায়, অথচ বাজারে পণ্যের দাম কমে না, তাহলে নীতিটির কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জিত হবে না।
সরকারকে এখন বাজার মনিটরিং আরও জোরদার করতে হবে। আমদানির প্রকৃত খরচ, জাহাজভাড়া, বিমা, শুল্ক-কর, গুদামজাতকরণ ও পরিবহন ব্যয়ের সঙ্গে পাইকারি ও খুচরা দামের সামঞ্জস্য নিয়মিত যাচাই করা দরকার। একই সঙ্গে অযৌক্তিক মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট ও সিন্ডিকেটের অভিযোগের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।
ভোগ্যপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা শুধু প্রশাসনিক অভিযান দিয়ে সম্ভব নয়; প্রয়োজন পূর্বাভাসভিত্তিক আমদানি নীতি, পর্যাপ্ত মজুত, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা থাকবেই। কিন্তু সেই অস্থিরতার পুরো বোঝা যেন দেশের সাধারণ ভোক্তার কাঁধে না পড়ে, সেটিই সরকারের প্রধান দায়িত্ব। বাজেটে দেওয়া আমদানি সুবিধার সুফল দ্রুত বাজারে প্রতিফলিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে আমদানি সুবিধা বাস্তবায়ন করতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









