কিছু জয় স্কোরকার্ডে লেখা থাকে, কিছু জয় লেখা থাকে ইতিহাসে। আর কিছু জয় এমন যার পর স্কোরকার্ডের সংখ্যাগুলোও যেন ছোট হয়ে যায়। ডারউইনের মাটিতে আজ বাংলাদেশ যে কাজটি করল, সেটি নিছক একটি টেস্ট জয় নয়; এটি দীর্ঘ অপেক্ষার ওপর আছড়ে পড়া এক লাল-সবুজ বজ্রপাত। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে ফিরে বাংলাদেশ স্বাগতিকদের ৯ উইকেটে হারিয়ে দিল।
যে অস্ট্রেলিয়াকে ক্রিকেটের সবচেয়ে কঠিন দুর্গগুলোর একটি মনে করা হয়, সেই দুর্গের দরজা বাংলাদেশ শুধু খুলে দেয়নি ভেতরে ঢুকে বসে বলেছে, ‘এবার আমাদেরও একটু জায়গা দিন।’
শিরোনাম তাই একটাই হতে পারে ক্যাঙ্গারুর পিঠে বাঘের থাবা। কারণ অস্ট্রেলিয়া শুধু একটি ক্রিকেট দল নয়; তারা ক্রিকেটের এক দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতার প্রতীক। তাদের মাটিতে তাদের বিপক্ষে জেতা মানে প্রতিপক্ষের ১১ জন ক্রিকেটারকে হারানোই নয়, হারানো তাদের পরিবেশ, আত্মবিশ্বাস, ইতিহাস এবং সেই অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক দেয়ালকেও। এতদিন বাংলাদেশ যখন অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি হয়েছে, ক্রিকেটীয় বাস্তবতা প্রায়ই বলেছে এখানে কাজটা কঠিন।
এবার বাংলাদেশ সেই বাস্তবতার দিকে তাকিয়ে যেন পাল্টা প্রশ্ন করেছে, ‘কঠিন মানেই কি অসম্ভব?’ এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো, বাংলাদেশ জেতেনি হঠাৎ কোনো অলৌকিকতায়। জয়টি এসেছে চার দিনের প্রতিটি স্তরে ধীরে ধীরে অস্ট্রেলিয়াকে চাপে ফেলে। প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ তুলেছে ৪২৬। তানজিদ হাসানের শতরান সেই ইনিংসের মেরুদণ্ড, আর পুরো ব্যাটিং ইউনিটের ধৈর্য ছিল তার ভিত্তি। ২২৮ রানের লিড নিয়ে বাংলাদেশ তখনই বুঝিয়ে দিয়েছিল এ সফরে তারা দর্শক হয়ে আসেনি। ক্রিকেটের ভাষায় ২২৮ রানের লিড একটি সংখ্যা। মনস্তত্ত্বের ভাষায় সেটি অস্ট্রেলিয়ার কপালে লেখা একটি প্রশ্নচিহ্ন।
কারণ অস্ট্রেলিয়া অভ্যস্ত প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে; এবার তারাই চাপের নিচে। যে দল সাধারণত প্রথম ইনিংসে বড় স্কোর তুলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তাদেরই দেখতে হলো বাংলাদেশের ব্যাটাররা কীভাবে সময়কে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করে। তানজিদের ব্যাটে শতরান ছিল শুধু রান নয় ছিল এক প্রজন্মের আত্মবিশ্বাসের ঘোষণা। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশি ব্যাটারের এমন ইনিংস যেন বলছিল, ‘বিদেশের মাটি বলে ব্যাটের আকার ছোট হয়ে যায় না।’ তারপর বল হাতে হাসান মাহমুদ। প্রথম ইনিংসে ছয় উইকেট, ম্যাচে মোট নয়।
ম্যাচসেরার পুরস্কার তাঁর হাতে ওঠা তাই কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ছিল বাংলাদেশের পেস আক্রমণের আত্মপ্রকাশের মুহূর্ত। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংকে যখন তিনি একের পর এক আঘাত করছিলেন, তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল শুধু উইকেটের সংখ্যা নয় ছিল তাঁর শরীরী ভাষা। সেখানে ভীতি ছিল না। ছিল না ‘অস্ট্রেলিয়া’ নামটির প্রতি অতিরিক্ত শ্রদ্ধা। ছিল কাজের প্রতি নিষ্ঠা। ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত এখানেই বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা এখন আর বড় দলের নাম দেখে ছোট হয়ে যাচ্ছেন না। আর মেহেদী হাসান মিরাজ? তাঁকে নিয়ে আলাদা করে কথা বলতেই হয়। ব্যাট হাতে ৬৫, বল হাতে দ্বিতীয় ইনিংসে পাঁচ উইকেট। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে পাঁচ উইকেট নেওয়া প্রথম বাংলাদেশি স্পিনার তিনি। এই পরিসংখ্যানের চেয়েও বড় তাঁর ভূমিকা মিরাজ যেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের সেই দীর্ঘ যাত্রার প্রতীক, যেখানে একজন তরুণ অফস্পিনার ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছেন এমন এক অলরাউন্ডারে, যিনি ম্যাচের গতিপথ দুই দিক থেকেই বদলে দিতে পারেন।
অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে অবশ্য গল্পটা এত সহজ ছিল না। ক্যামেরন গ্রিন ১০৪ রানের দুর্দান্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর ব্যাটে অস্ট্রেলিয়া আবারও ম্যাচে ফিরে আসার চেষ্টা করেছিল। ক্রিকেটের সৌন্দর্য এখানেই বড় পরাজয়ের মধ্যেও একজনের লড়াই কখনো কখনো পুরো দলের সম্মানকে কিছুটা বাঁচিয়ে রাখে। কিন্তু বাংলাদেশের বোলাররা এবার থামেনি। অস্ট্রেলিয়া শেষ পর্যন্ত ২৮৪ রানে অলআউট। বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য ৫৭।
সেখানেই যেন উপমার সবচেয়ে মজার জায়গাটি। অস্ট্রেলিয়ার সামনে তখন আর বাংলাদেশ ছিল না ছিল মাত্র ৫৭ রানের এক অনিবার্যতা। আর বাংলাদেশের সামনে ছিল ইতিহাস। ৫৭ রান খুব ছোট লক্ষ্য, কিন্তু ইতিহাসের দরজা কখনো ছোট হয় না। একটি উইকেট হারিয়ে, ১৪.২ ওভারে বাংলাদেশ সেই দরজা খুলে ফেলল। শাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক কাজটি শেষ করলেন এমন স্বচ্ছন্দে, যেন বহুদিন ধরে এই মুহূর্তটির মহড়া চলছিল।
এই জয়কে তাই ‘অঘটন’ বলার মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি অন্যায় হবে। অঘটন হয় যখন দুর্বল দল ভাগ্যের সহায়তায় শক্তিশালী দলকে একবার হারিয়ে দেয়। এখানে বাংলাদেশ চার দিনের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় অস্ট্রেলিয়াকে ছাড়িয়ে গেছে। ব্যাটিংয়ে, বোলিংয়ে, পরিকল্পনায়, ধৈর্যে, মানসিক দৃঢ়তায়। এটি কোনো এক ঘণ্টার ঝড় নয়; এটি চার দিনের ধারাবাহিক আধিপত্য।
এখানেই এই জয়ের সামাজিক ও মানসিক তাৎপর্য। বাংলাদেশের ক্রিকেটে দীর্ঘদিন একটি অদ্ভুত সংকট ছিল আমরা নিজেদের প্রতিভা নিয়ে গর্ব করতাম, কিন্তু বড় মঞ্চে নিজেদের সামর্থ্যের ওপর পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারতাম না। ভালো খেলেও শেষ মুহূর্তে হেরে যেতাম। বড় দলের বিপক্ষে জিতলেও সেটিকে ধারাবাহিকতার সূচনা না ভেবে বিস্ময় হিসেবে দেখতাম। ডারউইনের জয় সেই মানসিকতার বিরুদ্ধে এক বড় আঘাত। এটি প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশ চাইলে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে না; নিয়ন্ত্রণও নিতে পারে।
অবশ্য এই জয় নিয়ে উচ্ছ্বাসের মধ্যেও একটি সতর্কতা থাকা জরুরি। একটি টেস্ট জয় কোনো ক্রিকেট সংস্কৃতির পূর্ণাঙ্গ সাফল্যের সনদ নয়। বরং এটি সম্ভাবনার দরজা। বাংলাদেশের সামনে এখন আরও বড় প্রশ্ন—এই জয়কে কীভাবে একটি ধারাবাহিক শক্তিতে পরিণত করা যায়? একটি ঐতিহাসিক জয় যদি কেবল স্মৃতিচারণের উপকরণ হয়ে থাকে, তবে তার মূল্য সীমিত। কিন্তু যদি এই জয় থেকে আত্মবিশ্বাস, পেশাদারিত্ব, টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং তরুণদের বিকাশের সংস্কৃতি তৈরি হয়, তখন ডারউইন হয়ে উঠবে একটি বাঁকবদলের নাম। আজ তাই শুধু অস্ট্রেলিয়া হারেনি; বাংলাদেশের ক্রিকেটের পুরোনো ভয়ও কিছুটা হেরেছে। সেই ভয় ‘ওরা অস্ট্রেলিয়া।’ সেই সংকোচ ‘ওদের দেশে গিয়ে কীভাবে সম্ভব?’ সেই মানসিকতা ‘আগে বাঁচি, পরে জেতার কথা ভাবব।’ ডারউইনের চার দিনে বাংলাদেশ দেখিয়েছে, ক্রিকেটে সম্মান অর্জন করতে হলে আগে নিজের সামর্থ্যকে সম্মান করতে হয়।
ক্যাঙ্গারু লাফায়। বাঘ লাফায় না অপেক্ষা করে, হিসাব করে, তারপর থাবা মারে। বাংলাদেশও যেন এবার তাই করেছে। কোনো অতিরিক্ত হুঙ্কার নয়, কোনো কৃত্রিম আত্মবিশ্বাস নয়; ব্যাট হাতে ৪২৬, বল হাতে অস্ট্রেলিয়ার দুই ইনিংসের ১৯৮ ও ২৮৪, আর শেষে ৫৭ রান তাড়া করে জয়। সংখ্যাগুলোই আজ বাংলাদেশের হয়ে কথা বলছে। এই জয় তানজিদের শতরান, হাসান মাহমুদের নয় উইকেট, মিরাজের অলরাউন্ড নৈপুণ্য কিংবা পুরো দলের সম্মিলিত পারফরম্যান্সের যোগফল কিন্তু তার চেয়েও বেশি কিছু। এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের বহু বছরের অপেক্ষার একটি উত্তর।
যে প্রজন্ম শৈশবে বড় দলগুলোর বিপক্ষে বাংলাদেশের পরাজয় দেখেছে, আজ সেই প্রজন্মের সামনে নতুন একটি স্মৃতি। এমন স্মৃতি, যেখানে বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা কারও দিকে তাকিয়ে বলেনি ‘আমরা পারব তো?’ বরং মাঠে নেমে বলেছে ‘আমরাই পারব।’ ডারউইনের আকাশে আজ হয়তো সূর্য অস্ত গেছে। মাঠ খালি হয়েছে। স্টাম্প তুলে রাখা হয়েছে। স্কোরবোর্ডে লেখা হয়েছে বাংলাদেশ জয়ী, নয় উইকেটে। কিন্তু ক্রিকেটের ইতিহাসে আজ যে দাগ পড়ল, সেটি এত সহজে মুছে যাওয়ার নয়। ২৩ বছরের অপেক্ষার শেষে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ প্রথম টেস্ট জিতেছে। এবং সেই জয় এসেছে মাথা নত করে নয়, চোখে চোখ রেখে।
তাই আজকের দিনটি শুধু উদ্যাপনের নয়, আত্মবিশ্বাসেরও দিন। ক্রিকেটের পরাশক্তির উঠোনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আজ নিজের নাম উচ্চারণ করেছে একটু জোরে। সেই উচ্চারণে অহংকার নেই, আছে অর্জনের দীপ্তি। ক্যাঙ্গারুর দেশে আজ বাঘ গর্জন করেনি। বাঘ শুধু থাবা মেরেছে আর সেই এক থাবাতেই ইতিহাসের দরজা খুলে গেছে।
লেখক: কলামিস্ট ও প্রকৌশলী


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









