বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন এমন এক সংকটের মুখোমুখি, যাকে নিছক ‘মৌসুমি রোগের প্রাদুর্ভাব’ বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই। একদিকে ডেঙ্গুর বিস্তার, অন্যদিকে হামের ভয়াবহ পুনরুত্থান- দুটি সংক্রামক রোগ একই সময়ে মানুষের জীবন ও চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর যে চাপ তৈরি করেছে, তা আমাদের স্বাস্থ্যখাতের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা ও অব্যবস্থাপনাকে নগ্ন করে দিয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে শিশু ও সাধারণ মানুষকে। গত ছয় মাসের যে পরিসংখ্যান সামনে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে ভয়াবহ।
ডেঙ্গুতে হাজার হাজার মানুষ হাসপাতালে ভর্তি এবং বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হামে আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে এবং মৃত্যুও ঘটেছে বিপুলসংখ্যক। সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়- প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বজনহারা ঘর এবং একটি অসমাপ্ত জীবন।
হাসপাতালগুলোর চিত্র আরো উদ্বেগজনক। ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত রোগী, একই শয্যায় একাধিক শিশুর চিকিৎসা, করিডোর ও মেঝেতে রোগীর অবস্থান- এসব কোনো কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্বাভাবিক চিত্র হতে পারে না। সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে যেখানে আইসোলেশন ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে রোগীদের গাদাগাদি করে চিকিৎসা দেওয়া উল্টো সংক্রমণ বাড়িয়ে দিতে পারে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর অতিরিক্ত কর্মভারও পরিস্থিতিকে আরো জটিল করছে। এই সংকটের আরেকটি দিক হলো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দুর্বলতা। হাম এমন একটি রোগ, যার বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা রয়েছে।
অথচ বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে- এটি শুধু মাঠপর্যায়ের ব্যর্থতা নয়, বরং জাতীয় টিকাদান ব্যবস্থাপনার একটি বড় সতর্কসংকেত। কোনো টিকাদান কর্মসূচি কাগজে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করলেই সফল হয় না; প্রত্যন্ত অঞ্চল, বস্তি, চরাঞ্চল কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রতিটি শিশুর কাছে টিকা পৌঁছেছে কি না, সেটিই প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অতিরিক্ত ওষুধ, স্যালাইন ও পরীক্ষার কিট সরবরাহ এবং জরুরি মনিটরিংয়ের কথা বলেছে। এসব উদ্যোগ অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু সংকটের মাত্রা যদি হাসপাতালের করিডোর পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তাহলে শুধু সরবরাহ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত জরুরি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা। কোন হাসপাতালে কত রোগী, কোথায় শয্যা খালি, কোথায় অক্সিজেন ও আইসিইউ সুবিধা আছে, কোন রোগীকে কোথায় স্থানান্তর করা হবে- এসব তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
এ ক্ষেত্রে ট্রায়াজ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গুরুতর রোগী ও অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকির রোগীকে আলাদা করে চিকিৎসা দিতে না পারলে সীমিত স্বাস্থ্যসম্পদও সঠিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। প্রয়োজন হলে অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতাল বা ডেডিকেটেড ডেঙ্গু-হাম ইউনিট চালু করে বড় হাসপাতালের ওপর চাপ কমাতে হবে। তবে সংকট মোকাবিলার নামে আরেকটি ভুল করা যাবে না- হাম ও ডেঙ্গুর রোগীকে একই ব্যবস্থাপনার মধ্যে ফেলে দেওয়া। দুই রোগের চিকিৎসা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং জটিলতা ভিন্ন। তাই হাসপাতালভিত্তিক পৃথক প্রটোকল, প্রশিক্ষিত জনবল এবং পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে হবে।
হাম ও ডেঙ্গুর এই যুগপৎ আঘাত আমাদের সামনে একটি কঠিন সত্য তুলে ধরেছে: সংকট শুরু হওয়ার পর হাসপাতালের শয্যা বাড়ানোই জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নয়। প্রকৃত জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা হলো রোগ ছড়িয়ে পড়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা, টিকা নিশ্চিত করা, মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণ করা, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রয়োজনের সময় দ্রুত চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া। আজ হাসপাতালের বারান্দায় যে শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে, তার দায় শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতারও পরীক্ষা।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মানুষের কষ্টও একইভাবে আমাদের ব্যর্থতার আয়না। তাই এই সংকটকে সাময়িক দুর্যোগ হিসেবে দেখে কিছুদিন অভিযান চালিয়ে আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেলে চলবে না। হাম-ডেঙ্গুর এই দ্বিমুখী আঘাত থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনই স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। জরুরি বাজেট, দ্রুত সিদ্ধান্ত, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণ, সর্বজনীন টিকাদান, শক্তিশালী রোগ নজরদারি এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন- এই ছয়টি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই সংকট মোকাবিলা করতে হবে।
মানুষের জীবন রক্ষার চেয়ে বড় কোনো প্রশাসনিক অগ্রাধিকার হতে পারে না। এখন সময় দায় এড়ানোর নয়, দায়িত্ব নেওয়ার। কারণ হাসপাতালের করিডোরে জায়গা না পাওয়া রোগীর সংখ্যা যদি রাষ্ট্রের কাছে সতর্কসংকেত না হয়, তাহলে আগামী দিনের আরো বড় মহামারির জন্য আমরা নিজেরাই পথ তৈরি করব।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









