মানবসভ্যতার বিকাশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সভ্যতা যত এগিয়েছে, শিক্ষা ততই তার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেছে। শিক্ষা মানুষকে কেবল জীবিকা অর্জনের পথ দেখায়নি; বরং চিন্তার বিস্তার ঘটিয়েছে, যুক্তিবোধ জাগ্রত করেছে এবং সমাজকে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করেছে। শিক্ষা মানুষের ভেতরের মানুষটিকে গড়ে তোলে- এটিই ছিল শিক্ষার চিরন্তন দর্শন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দর্শনে এক অদ্ভুত বিচ্যুতি ঘটেছে। আজকের শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমশ তার মৌলিক লক্ষ্য থেকে সরে এসে সার্টিফিকেট, নম্বর ও ফলাফলনির্ভর এক যান্ত্রিক কাঠামোতে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে শিক্ষা বলতে আমরা যা বুঝি, তার বড় অংশজুড়ে রয়েছে পরীক্ষায় ভালো করা, উচ্চ নম্বর অর্জন এবং ঝকঝকে সার্টিফিকেট সংগ্রহের প্রতিযোগিতা। শেখার আনন্দ, জানার কৌতূহল কিংবা জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার সক্ষমতা- এসব বিষয় ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে। ফলস্বরূপ, আমরা এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করছি যারা কাগজে-কলমে শিক্ষিত, কিন্তু বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অপ্রস্তুত; যারা ডিগ্রি অর্জনে সফল, কিন্তু মানবিক ও নৈতিক সংকটে দিশেহারা।
শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কখনোই কেবল তথ্য মুখস্থ করা বা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া ছিল না। প্রকৃত শিক্ষা মানুষের চিন্তাকে মুক্ত করে, তাকে প্রশ্ন করতে শেখায়, সত্য ও ন্যায়ের পথে দাঁড়াতে সাহস জোগায়। কিন্তু আজকের শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের শেখাচ্ছে কীভাবে পরীক্ষার খাতায় নির্দিষ্ট উত্তরের মাধ্যমে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া যায়। ফলে শিক্ষার গভীরতা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে।
সার্টিফিকেটসর্বস্ব শিক্ষা বলতে এমন এক শিক্ষাব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে জ্ঞান অর্জনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় পরীক্ষার ফলাফল ও সনদপত্র। এই ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা শেখে পরীক্ষার জন্য, জীবনের জন্য নয়। মুখস্থবিদ্যা, গাইডবই, কোচিং সেন্টার ও প্রশ্ন ফাঁসনির্ভর প্রস্তুতি শিক্ষার স্বাভাবিক ধারাকে গ্রাস করেছে। শিক্ষা পরিণত হয়েছে এক ধরনের দৌড়ে যেখানে কে কত দ্রুত এবং কত বেশি নম্বর তুলতে পারছে, সেটাই হয়ে উঠেছে সাফল্যের মানদণ্ড।
মানবসভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ জীবন ও প্রকৃতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছে। সময়ের প্রয়োজনে শিক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হলেও তার মূল উদ্দেশ্য ছিল মানবিক গুণাবলি ও দক্ষতার বিকাশ। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যায় একটি শিশুর শৈশব শেষ হওয়ার আগেই তাকে বইয়ের বোঝা ও পরীক্ষার চাপে জর্জরিত করা হয়। ভালো নম্বর না পেলে পরিবার, সমাজ এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও শিশুটি চাপ ও হতাশার মুখে পড়ে।
এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার ফলে শিশুর স্বাভাবিক কৌতূহল, খেলাধুলা, কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীলতা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। তারা শিখছে কীভাবে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকতে হয়, কিন্তু শিখছে না কীভাবে মানুষ হতে হয়। শৈশবের এই মানসিক চাপ ভবিষ্যতে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, ভীতি ও হতাশার জন্ম দেয়, যার প্রভাব পড়ে পুরো জীবনে।
পরিসংখ্যান ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে- প্রতি বছর উচ্চশিক্ষিত তরুণদের সংখ্যা বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা অসংখ্য তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু তাদের একটি বড় অংশ প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে পিছিয়ে পড়ছে। তারা বইয়ে পড়া তত্ত্ব জানে, কিন্তু বাস্তব সমস্যার সমাধানে অক্ষম। স্বাধীন চিন্তা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা এসব ক্ষেত্রে তারা দুর্বল। এর মূল কারণ হলো, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা জ্ঞানের প্রয়োগ শেখাতে ব্যর্থ। শিক্ষার্থীরা জানে ‘কী’, কিন্তু জানে না ‘কীভাবে’। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, তরুণ সমাজ হতাশ হয়ে পড়ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি সামাজিক ও মানসিক সংকট তৈরি করছে।
এই সার্টিফিকেটকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাব কেবল কর্মক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এর গভীর প্রভাব পড়ছে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। প্রত্যাশার চাপ, ব্যর্থতার ভয় ও আত্মমূল্যবোধের সংকট তরুণদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। হতাশা, একাকীত্ব ও আত্মগ্লানি অনেক ক্ষেত্রে চরম রূপ নিচ্ছে, যা সমাজের জন্য অশনিসংকেত।
একই সঙ্গে সমাজে নৈতিকতার অবক্ষয়ও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দুর্নীতি, অসহিষ্ণুতা ও স্বার্থপরতার প্রবণতা বাড়ছে। শৈশব থেকেই ‘সফলতা’কে অন্ধভাবে তাড়া করার ফলে নতুন প্রজন্মের বিবেকবোধ ও নৈতিক চিন্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থা যদি নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়, তবে তার পরিণতি ভয়াবহ হওয়াই স্বাভাবিক।
আমরা যদি সত্যিই একটি উন্নত, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে চাই, তবে শিক্ষাব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। সার্টিফিকেট ও ফলাফলনির্ভর শিক্ষা থেকে বের হয়ে শিক্ষাকে করতে হবে শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক, সৃজনশীল ও অংশগ্রহণমূলক।
মুখস্থনির্ভর পাঠ্যক্রমের পরিবর্তে বিশ্লেষণী চিন্তা, সমস্যা সমাধান ও বাস্তব প্রয়োগভিত্তিক শিক্ষা চালু করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা ও স্বাধীন চিন্তার চর্চা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জন অত্যন্ত জরুরি। তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটাতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে নৈতিকতা, মানবিকতা ও মূল্যবোধের চর্চা নিশ্চিত করা। শিক্ষা যেন কেবল দক্ষ কর্মী নয়, বরং দায়িত্বশীল, বিবেকবান ও ন্যায়পরায়ণ নাগরিক তৈরি করে এই লক্ষ্যকে সামনে রাখতে হবে।
শিক্ষা কোনো কারখানা নয়, যেখানে নির্দিষ্ট ছাঁচে মানুষ তৈরি হবে। শিক্ষা মানুষের চিন্তাকে মুক্ত করে, তাকে আলোকিত করে এবং সমাজের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করে। সার্টিফিকেট ও ডিগ্রি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এগুলো কখনোই শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে পারে না। প্রকৃত শিক্ষা মানুষ গড়ে তোলে চরিত্রে, চিন্তায় ও কর্মে।
আজ সময় এসেছে সার্টিফিকেটসর্বস্ব ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার। শিক্ষা যদি মানুষ গড়তে পারে, তবেই একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও টেকসই সমাজ গড়ে ওঠা সম্ভব।
লেখক : শিক্ষার্থী


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









