বেশ কিছুদিন আগে একটি পত্রিকায় পানি সংকটের একটি চিত্র তুলে ধরে। চিত্রটি এমন- সেখানকার একজন চাকরিজীবী বলছেন, তার মাসে চার হাজার টাকার মতো পানি কিনতে হয়। নলকূপে পানি উঠে না। উঠলেও লবণাক্ত। চারপাশে মানুষ পানি না পেয়ে হাহাকার করছে। কিন্তু সমাধানের কোনো পথ নেই।
লবণাক্ততা যদি বাড়তে থাকে সুপেয় পানির একটা বড় সংকট তৈরি হবে। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু কৃষিভূমি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, সারা বিশ্বে ১.৩৮ বিলিয়ন হেক্টর ভূমি লবণাক্ততার কবলে পড়ছে। এতে কৃষি, সুপেয় পানি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। মাটির উর্বরতা কমে যাবে। শস্য ফলবে না। খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। আমরা যদি বাংলাদেশের দিকে তাকাই এই ভয়াবহতা আরো কাছ থেকে দেখতে পাব। সরকারের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আশঙ্কাজনক ভাবে বাড়ছে লবণাক্ততা। সেখানে গত ১৫ বছরে ১ লাখ হেক্টর আবাদি জমি লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ উপকূলীয় ১৯ জেলার ১৮ জেলাতেই এখন লবণাক্ত কৃষিভূমি দেখা যাচ্ছে।
কীভাবে এই কৃষি জমিগুলো লবণাক্ত হয়ে পড়ে। মাটিতে বা পানিতে অতিরিক্ত লবণ থাকলেই তাকে লবণাক্ততা বলা হয়। সমুদ্রের পানি ঢোকার পর বাষ্পীভবন হলে লবণগুলো মাটিতে থেকে যায়। এইসব লবণে সোডিয়াম ও ক্লোরিন আয়ন থাকে। এরা পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম ও নাইট্রেট আয়নের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। এসব ফসলের ফলনকে ব্যাহত করে।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) মতে, দেশের আবাদযোগ্য জমির ৩০ শতাংশের বেশি উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত। ২০০৯ সালে দেশের উপকূলীয় এলাকা ও চরাঞ্চলে লবণাক্ত জমির পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর। বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ১১ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর। দেড় দশকে লবণাক্ত জমির পরিমাণ বেড়েছে ১ লাখ হেক্টর। আমরা যদি লবণাক্ত জমিকে তিন ভাগে ভাগ করি অর্থাৎ লবণমুক্ত, খুব সামান্য লবণাক্ত এবং উচ্চমাত্রার লবণাক্ত, তাহলে দেখা যাবে অনেক এলাকাই এখন উচ্চ লবণাক্ত। গবেষকদের তথ্য মতে, উপকূলীয় দক্ষিণ-মধ্য অঞ্চলের কিছু অংশ কম লবণাক্ত। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এখানে পদ্মা ও মেঘনা নদীর স্বাদু পানির প্রবাহ আছে। উপকূলের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে উচ্চমাত্রার লবণাক্ত জমি রয়েছে। কেননা, এখানে গড়াই, মধুমতী ও কপোতাক্ষ নদীর পানি প্রবাহ কমে গেছে।
কেন এমনভাবে লবণাক্ত জমি বেড়ে যাচ্ছে- তার কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন- সমুদ্রপৃষ্ঠের বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষ, স্বাদুপানির প্রবাহ কম থাকা- এই কারণগুলো প্রধানত দায়ী। বিশ্ব ব্যাংকের গবেষণা মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে খরার সময় নদীর লবণাক্ততায় পরিবর্তন আসবে। এতে করে পানীয় ও সেচের পানির ঘাটতি দেখা যাবে। মাছের উৎপাদন কমে যাবে।
লবণাক্ততার বৃদ্ধি মানুষের স্বাস্থের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। উচ্চ রক্তচাপ, খিঁচুনি, কলেরা, অকাল গর্ভপাত, অপুষ্টি ও বিকলাঙ্গ শিশু জন্মাবে।
জমি লবণাক্ত হলে কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাবে। মাটির উর্বরতা নষ্ট হবে। গাছের খাদ্য ও পানি শোষণ ব্যাহত হবে। বিশুদ্ধ পানির সংকট বেড়ে যাবে। স্বাদু পানির মাছ ও জীববৈচিত্র্য নষ্ট হবে। জলজ উদ্ভিদ ও জলজ প্রাণী মারা যাবে। জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে।
এজন্য লবণাক্ত সহনশীল জাতের ফসল চাষ করতে হবে। মাটি থেকে লবণ ধুয়ে ফেলার জন্য স্বাদুপানি ব্যবহার করতে হবে। উন্নত সেচ ব্যবস্থা, সার ব্যবহার, উঁচু জমি ব্যবহার, লবণাক্ত সহনশীল ফসলের চাষ বাড়াতে হবে। উন্নত সেচ ব্যবস্থা করতে হলে এবং স্বাদুপানির প্রবাহ বাড়াতে হলে খাল, নদী ও পুকুর খনন করতে হবে। যাতে করে স্বাদু পানি সেখানে সংরক্ষিত থাকে। এসব স্বাদু পানির প্রবাহ দিয়ে মাটির লবণ সরিয়ে ফেলা যাবে। লবণাক্ত জলাধার তৈরি করা যেতে পারে। যাতে করে লবণাক্ত পানি ছড়াতে পারবে না।
চিংড়ি ঘেরের লবণাক্ত পানি যাতে ঘের থেকে ছড়িয়ে পড়তে না পারে- তার ব্যবস্থা রাখতে হবে। উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকট বেশ ভালোভাবেই চোখে পড়ছে। সেখানকার অনেক পুকুর ও দীঘি লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে পানযোগ্য পানি তো নেই-ই, গৃহস্থালির কাজে যে পানি ব্যবহার করা হবে, সেই পানিরও অভাব সৃষ্টি হচ্ছে। লবণের মাত্রা এতটা বেড়ে গেছে, অগভীর ও গভীর নলকূপের পানিও নিরাপদ নেই। উপকূলীয় এলাকায় বর্তমানে ৮০ থেকে ৯০ ভাগ নলকূপের পানি লবণাক্ত।
ধান, ডাল ও অন্যান্য শস্য এখন উৎপাদন করা সেখানে ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফসলের বৈচিত্র্য কমে যাচ্ছে। ডাল ও সরিষাবীজ অঙ্কুরিত হতে না পারার কারণে আবাদ কমে যাচ্ছে। আবাদ কমে যাচ্ছে মুগ ডালেরও। কৃষকেরা ধান চাষের ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না। অনেক জমি অনাবাদি হয়ে পড়ে রয়েছে। ধীরে ধীরে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে থাকলে এই লবণাক্ততা আরো ছড়িয়ে পড়বে। চিংড়ি ঘের বাড়ছে। কিন্তু শস্যজমি কমে যাচ্ছে। কমে যাচ্ছে খাদ্য উৎপাদন।
এভাবে ঝুঁকিতে পড়ছে লাখ লাখ মানুষ। একদিকে নগরায়ণের কারণে যেমন কৃষিজমি কমছে, অন্যদিকে কৃষিজমি কমছে লবণাক্ততার কারণে। তাই এখন থেকেই লবণাক্ত কৃষিজমি নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। লবণাক্ত সহনশীল ধান ও অন্যান্য শস্যের জাত উদ্ভাবন করতে হবে। পাশাপাশি লবণাক্ততা যাতে ছড়িয়ে না পড়ে তার ব্যবস্থা নিতে হবে। যে সমস্ত জমি লবণাক্ত হয়ে পড়েছে, সে সমস্ত জমি থেকে লবণ সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার সাথে সাথে আমরা খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়ে যাব।
লেখক: পরিবেশ বিষয়ক লেখক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









