প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে জুয়ার চেহারাও বদলে গেছে। এক সময় জুয়া মানেই ছিল নির্দিষ্ট কোনো স্থানে বসে তাস, পাশা কিংবা অন্য কোনো খেলায় অর্থের বিনিময়ে বাজি ধরা। এখন একটি স্মার্টফোন, একটি ইন্টারনেট সংযোগ এবং একটি ডিজিটাল পেমেন্ট মাধ্যমই যথেষ্ট।
ঘরের ভেতর বসেই মুহূর্তে অনলাইন বেটিং, ক্যাসিনো কিংবা খেলাধুলার নামে জুয়ার প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করা যায়। ফলে, দেড়শ’ বছরের পুরোনো আইনি কাঠামো দিয়ে এই নতুন বাস্তবতাকে মোকাবিলা করা যে কঠিন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এই বাস্তবতায় জুয়া প্রতিরোধ আইন ২০২৬ সময়োপযোগী উদ্যোগ। অনলাইন জুয়া, বেটিং, ম্যাচ ফিক্সিং, স্পট ফিক্সিং, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, ভুয়া সিম ও ভুয়া আর্থিক হিসাবসহ আধুনিক অপরাধের বিভিন্ন দিককে আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। অপরাধকে আমলযোগ্য ও অ-জামিনযোগ্য করার মতো কঠোর বিধানও অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান প্রকাশ করে।
তবে একটি কঠিন প্রশ্ন থেকেই যায়- আইন করলেই কি অনলাইন জুয়া থেমে যাবে? উত্তর হলো, শুধু আইন দিয়ে নয়। অনলাইন জুয়ার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর সীমাহীন ভৌগোলিক বিস্তার। একটি ওয়েবসাইট বাংলাদেশে বসে পরিচালিত না হলেও বাংলাদেশের মানুষের কাছে তার সেবা পৌঁছে দিতে পারে। সার্ভার থাকতে পারে বিদেশে, পরিচালনাকারী থাকতে পারেন অন্য দেশে, অর্থের প্রবাহ যেতে পারে একাধিক ডিজিটাল ওয়ালেট ও ক্রিপ্টোকারেন্সি ঠিকানার মধ্য দিয়ে। একটি ডোমেইন বন্ধ হলে কয়েক ঘণ্টা বা তারও কম সময়ে নতুন মিরর সাইট চালু করা সম্ভব। ফলে কেবল ওয়েবসাইট ব্লক করে এই অপরাধ নির্মূল করা যাবে- এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থের প্রবাহ। অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হলে শুধু জুয়ার ওয়েবসাইট নয়, এর আর্থিক অবকাঠামোকেও চিহ্নিত করতে হবে। কারা এজেন্ট, কারা টাকা সংগ্রহ করছে, কোন হিসাব থেকে অস্বাভাবিক লেনদেন হচ্ছে, কীভাবে অর্থ দেশের বাইরে যাচ্ছে- এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। কারণ, জুয়ার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করলেও যদি অর্থের দেশীয় নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকে, তাহলে অপরাধীরা নতুন পথ খুঁজে নেবে।
এখানে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। সাইবার ফরেনসিক, ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ, লেনদেন বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নাগরিকের অধিকার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। জুয়া দমনের নামে নির্বিচারে নজরদারি কিংবা যথাযথ কারণ ছাড়া ব্যক্তির হিসাব জব্দ করা হলে আইনের উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
বিশেষ করে ডিজিটাল প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আইপি অ্যাড্রেস, ডিভাইসের তথ্য, লেনদেনের রেকর্ড, ডিজিটাল লগ কিংবা অন্যান্য ইলেকট্রনিক তথ্য আদালতে যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে না পারলে কঠোর আইনও কার্যত দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তাই তদন্তকারী সংস্থা, প্রসিকিউশন এবং বিচারব্যবস্থার প্রযুক্তিগত দক্ষতা সমানতালে বাড়ানো জরুরি। আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও অপরিহার্য। যেহেতু অনলাইন জুয়ার অনেক প্ল্যাটফর্ম দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত হতে পারে, তাই শুধু দেশের ভেতরের আইন প্রয়োগ করে মূল হোতাদের ধরার সুযোগ সীমিত। সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিদেশি আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান, দ্রুত আইনি সহায়তা এবং যৌথ তদন্তের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
সুতরাং জুয়া প্রতিরোধ আইন ২০২৬-কে আমরা স্বাগত জানাই, কিন্তু এটিকে কেবল একটি কঠোর দণ্ডবিধি হিসেবে দেখলে চলবে না। এই আইন সফল করতে প্রয়োজন আইন, প্রযুক্তি, আর্থিক নজরদারি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জনসচেতনতার সমন্বিত প্রয়োগ। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের নামে যেন নির্দোষ নাগরিক হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে লড়াই মূলত একটি প্রযুক্তিনির্ভর বৈশ্বিক অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই। তাই শুধু নতুন আইন করে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। আইনকে কার্যকর করার মতো দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি, শক্তিশালী ফরেনসিক অবকাঠামো এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।
আইন অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে প্রথম অস্ত্র হতে পারে, কিন্তু একমাত্র অস্ত্র নয়। আইনকে কার্যকর প্রযুক্তি, স্বচ্ছ প্রয়োগ এবং সামাজিক প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলেই জুয়ার ডিজিটাল সাম্রাজ্যে সত্যিকার অর্থে আঘাত হানা সম্ভব। অন্যথায় কঠোর আইনের ভাষা কাগজেই থেকে যাবে, আর জুয়ার চক্র নতুন ডোমেইন, নতুন অ্যাপ ও নতুন প্রযুক্তির আড়ালে আবারও ফিরে আসবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









