সকালে স্থানীয়রা যখন দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত ছিলেন, ঠিক তখনই উজান থেকে ১০০ মিটার উঁচু এক দানবীয় পানির দেয়াল ধেয়ে আসে নেপালের রসুয়া ও নুয়াকোট জেলার জনবসতিপূর্ণ এলাকায়। চোখের পলকে অনেক বাড়ি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে যায়। স্রোতে তলিয়ে যায় কাস্টমস পয়েন্টে অপেক্ষমান তিন শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাক ও গাড়ি।
গত ২৬ আগস্ট বুধবার নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় ভোটকোশি নদীতে হঠাৎ পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ার পর ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। প্রবল স্রোতে ভেসে যায় ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, সরকারি স্থাপনা ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। তিব্বত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে হড়পা বানে বুধবার নেপালে মৃতের সংখ্যা ১৬০ ছাড়িয়েছে। এখনো ৫ শতাধিক পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। আরো নিখোঁজ রয়েছেন কয়েক ডজন সেনা, পুলিশ সদস্য ও বিদ্যুৎকর্মীও।
প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেন, প্রাণঘাতী আকস্মিক বন্যার ঘটনায় তার হৃদয় ভারাক্রান্ত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিতে পুরো জাতি স্তম্ভিত ও গভীরভাবে মর্মাহত। তিনি এই দুর্যোগকে ‘আকস্মিক’ ও ‘ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করেন। বালেন্দ্র শাহ বলেন, উদ্ধার অভিযান শুরু করতে সরকার কোনো ধরনের বিলম্ব না করে তাৎক্ষণিক সব ধরনের সম্পদ ও সক্ষমতা কাজে লাগিয়েছে।
নেপালে আঘাত হানা ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনায় গভীরভাবে শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে গত বুধবার এক শোক বার্তায় তিনি নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এবং নেপালের জনগণের প্রতি বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে আন্তরিক সমবেদনা জানান।
শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নেপালে ভয়াবহ বন্যায় বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানির মর্মান্তিক ঘটনায় আমি গভীরভাবে শোকাহত ও ব্যথিত। আমাদের চিন্তা ও প্রার্থনা প্রিয়জন হারানো সেসব পরিবার ও মানুষের সাথে রয়েছে, যাঁদের এই অপূরণীয় ক্ষতি বহন করতে হচ্ছে।’
এই কঠিন বিপর্যয়ে বাংলাদেশ নেপালের পাশে রয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দুর্যোগের এই সংকটময় মুহূর্তে নেপালকে যে কোনো প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে বাংলাদেশ সরকার প্রস্তুত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বন্যায় নিহত ব্যক্তিদের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সহমর্মিতা প্রকাশ করেন।
জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস জানিয়েছে, নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখানো সময়ের মিনিট সাতেক আগে সেখানে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল। এর উৎপত্তিস্থল নেপালের গোসাইকুন্ড হ্রদ থেকে ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে। প্রাথমিকভাবে কাঠমান্ডুর উত্তরে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে এই ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে কম্পনটি শনাক্ত হয়েছিল। তবে পরে ইউএসজিএস স্পষ্ট করে জানায়, সেখানে কোনো ভূমিকম্পই হয়নি। এই আকস্মিক বন্যার পেছনে প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পকে দায়ী করা হলেও এর জন্য হিমবাহ ধস ও ভূমিধস দায়ী বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)।
বুধবার সকালে ভূমিকম্প হিসেবে যে কম্পন শনাক্ত করা হয়েছিল, পরে সেটিকে হিমবাহ ধস ও পাথর-মাটির স্রোত (ডেব্রিস ফ্লো) হিসেবে চিহ্নিত করে সংস্থাটি। এর ফলে ভাটির দিকে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নেপাল-চীন রাসুওয়াগাড়ি সীমান্ত চৌকি থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে লহেন্দে নদীতে বরফ ও পাথরের বিশাল ভূমিধস হয়। এতে নদীতে বিপুল পরিমাণ পাথর, কাদা ও পানি নেমে গিয়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। এই শক্তিশালী ভূমিধসের তীব্রতা পরে ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য হিসেবে রেকর্ড করা হয়। বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ নেই। তাই পুলিশ ব্যারাকের বাইরে মোবাইল ফোনের আলো ব্যবহার করে নিখোঁজদের নাম নথিভুক্ত করছে।
ভোটকোশি নদীর তীরের রসুয়া ও নুয়াকোট জেলার বেশ কয়েকটি জনবসতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এলাকাগুলো জনবিরল হলেও সেখানকার সড়কগুলো নেপাল-চীন বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রধান রুট। জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, মহাসড়ক এবং সেতুসহ ওই এলাকার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধসে পড়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসেও ভোটকোশি নদীতে একই ধরনের হড়পা বান হয়েছিল। সে সময় অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাসুয়ায় নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে একটি হিমবাহের হ্রদ ফেটে যাওয়ায় লেহন্দে নদীতে আকস্মিক জলস্রোত নেমেছিল। তুষারধসের কারণে হিমবাহ ভেঙে হড়পা বানের বিপদসঙ্কেত দেওয়া হয়েছিল ২০১৯ সালের এক গবেষণায়। তাতে বলা হয়েছিল, জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে এই শতাব্দীর শুরু থেকে প্রতি বছর দেড় ফুটেরও বেশি উচ্চতার বরফ গলে যাচ্ছে হিমালয়ের হিমবাহগুলোতে।
নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী রসুয়া জেলার স্যাফ্রু বেসি গ্রামের বাসিন্দা ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের ট্রেকিং গাইড সোনাম দর্জিও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তিনি জানান, স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে তাঁর গ্রামে আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে। তবে এর এক ঘণ্টা আগেই তিনি একটি কাজে কাঠমান্ডুর উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। তাঁর বোন দেচেন তামাং, ভগ্নিপতি এবং পরিবারের আরো কয়েকজন সদস্য এখনো নিখোঁজ। গ্রাম ছাড়ার সময় তিনি বন্যার ভয়াবহ শব্দ শুনতে পান।
তিনি বলেন, মনে হচ্ছিল ভূমিকম্প হচ্ছে। আমার বাড়ি ধসে গেছে। সোনাম দর্জি বন্যাকে ‘হঠাৎ ও ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, অনেক মানুষ এখন ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে রয়েছেন। তাঁদের জরুরি উদ্ধার ও সরিয়ে নেওয়া, খাবার, অস্থায়ী আশ্রয় এবং চিকিৎসাসেবা প্রয়োজন। বোনকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা এখনো ছাড়েননি সোনাম। তিনি বলেন, আমরা আশা করছি, তাঁকে জীবিত পাওয়ার সম্ভাবনা হয়তো ১০ শতাংশ।
রসুয়া থেকে কিছুটা ভাটিতে বিদুর এলাকা। সেখানেই কর্মরত ছিলেন বিবেক। এখন রাজধানী কাঠমান্ডুর ন্যাশনাল ট্রমা সেন্টারে চিকিৎসাধীন বিবেক। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে জানান, শুরুতে কেমন একটা ‘হিসহিস’ শব্দ শুনতে পাচ্ছিলেন। তিনি গর্তের ভেতর কাজ করছিলেন। আরো চারজন শ্রমিক পাঁচ ফুট গভীর গর্তের ওপরে ছিলেন। তাঁরা বিবেককে গর্ত থেকে উঠে দৌড়ে পালাতে বলেন। বিবেক গর্ত থেকে বের হওয়ার আগেই তাঁর সহকর্মীরা পালিয়ে যান। বিবেকও সেই চেষ্টা করেন। কিন্তু পারেননি। হাসপাতালে ভাই দিনেশকে পাশে রেখে বিবেক বলেন, ‘আমি দৌড়াতে শুরু করি। এরপর ভূমিকম্পের মতো কাঁপুনি, বিকট শব্দে ঢল নেমে আসে।’ প্রবল ঢলে ভেসে যান বিবেক। ভাগ্য ভালো, একটি আমগাছে আটকে যান। তাতেই প্রাণরক্ষা হয় এই তরুণের। বিবেক বলেন, ‘ভাগ্য ভালো ছিল বলে আমি একটা আমগাছে আটকে যাই। গাছটা না থাকলে আমি ভেসে মারা যেতাম।’ বেঁচে যাওয়া বিবেক বলেন, আমগাছটা আঁকড়ে ধরে তিনি দেখতে পান, যেই বাড়িতে তাঁরা কাজ করছিলেন, সেটিও প্রবল ঢলে ভেসে যাচ্ছে। মুহূর্তে পুরো বাড়ি অদৃশ্য হয়ে যায়।
বন্যাকবলিত এলাকাটি হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র দুটি উচ্চভূমির হ্রদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এর একটি হলো তিব্বতের কৈলাস পর্বতের কাছে মানস সরোবর, অন্যটি নেপালের রাসুয়া জেলার গোসাইকুণ্ড হ্রদ। প্রতি বছর কয়েক হাজার পর্যটক নেপাল হয়ে মানস সরোবরে যান। বছরের এই সময়টিতে, বিশেষ করে ভারতীয় পর্যটকেরা, মানস সরোবর ভ্রমণ এবং গোসাইকুণ্ডে পবিত্র স্নান করতে আসেন। আলপাইন কৈলাস ট্রেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ পাণ্ডিত বিবিসিকে বলেন, এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি রুট। পূর্ণিমার সময়টি শুভ বলে বিবেচিত হওয়ায় পর্যটকেরা সাধারণত এই সময়েই এখানে আসেন।
তীর্থ স্থানে আসা অনেক পর্যটক এখনো নিখোঁজ রয়েছে। বন্যার প্রভাব আরো বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের আশঙ্কা, লেন্দে নদীর উজানে এখনো মাটি ও বরফের বড় অংশ আটকে থাকায় নতুন করে পানির প্রবাহ সৃষ্টি হতে পারে। ফলে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে আবারও বন্যার ঝুঁকি রয়েছে। নেপালের নদীগুলোর পানি ভারতের ভূখণ্ডে প্রবেশ করায় দেশটির বিহার ও উত্তর প্রদেশেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে সেনাবাহিনী ও পুলিশ। আমরা আশা করছি, নেপালের দুর্গত মানুষ খুব শীঘ্রই ভালো অবস্থানে ফিরে যাবেন।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









