বিদ্যুতের আলো শুধু ঘর আলোকিত করে না, সচল রাখে একটি দেশের অর্থনীতির চাকা। শিল্প-কারখানার উৎপাদন থেকে শুরু করে হাসপাতালের জরুরি সেবা, শিক্ষার্থীর পড়াশোনা থেকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন—সবকিছুর সঙ্গে বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অথচ সেই বিদ্যুৎ নিয়েই এখন দেশে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। গ্যাসের সংকট, কয়লার ঘাটতি, বিদ্যুৎকেন্দ্রে একের পর এক কারিগরি ত্রুটি এবং তীব্র গরমে বাড়তি চাহিদা—সব মিলিয়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে যেন সংকটের পর সংকট ঘনীভূত হচ্ছে।
দেড় মাসের বেশি সময় ধরে গ্যাসের তীব্র সংকটের পাশাপাশি এক মাস ধরে কয়লার অভাবে ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। এর মধ্যে আদানিসহ কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন আরো কমেছে। ফলে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও সেই সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান বাড়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও বাস্তবে উৎপাদন হচ্ছে তার অর্ধেকেরও কম। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও গ্যাসের অভাবে উৎপাদন নেমে এসেছে ৫ হাজার মেগাওয়াটের নিচে। কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর অবস্থাও স্বস্তিদায়ক নয়। আদানি, পায়রা, আরএনপিএল, বড়পুকুরিয়াসহ একাধিক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
এই পরিস্থিতিতে ফার্নেস অয়েলনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এটি কোনো টেকসই সমাধান নয়। বরং তুলনামূলক ব্যয়বহুল জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ালে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় যেমন বাড়বে, তেমনি পিডিবির লোকসান ও সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়বে। তার ওপর প্রয়োজনের তুলনায় ফার্নেস অয়েল সরবরাহের ঘাটতি থাকায় এ উদ্যোগও কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
জ্বালানি সংকটের অভিঘাত এখন সরাসরি পৌঁছে গেছে মানুষের ঘরে। কোথাও গ্যাসের চাপ এত কম যে রান্নার চুলা জ্বলছে না; কোথাও সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ হচ্ছে গাড়ির সারি। তীব্র গরমে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলছে। ফ্যান-এসি বন্ধ থাকছে, পানির পাম্প চালানো যাচ্ছে না, ব্যাহত হচ্ছে মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবাও। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ।
শিল্প খাতেও এর প্রভাব গভীর। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, ইস্পাত-রডসহ বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানা উৎপাদন চালাতে পারছে না। বিকল্প হিসেবে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে গিয়ে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। এতে শুধু উদ্যোক্তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও হুমকির মুখে পড়ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়; নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সময় লাগে। কথাটি বাস্তবসম্মত হলেও প্রশ্ন হলো—দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি কেন থাকবে? বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, সময়মতো কয়লা ও গ্যাস সংগ্রহ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতির জন্য বিকল্প পরিকল্পনা থাকা জরুরি।
বর্তমান সংকটকে শুধু সাময়িক লোডশেডিং হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি বড় সতর্কবার্তা। আজ গ্যাস নেই, কয়লা নেই; আগামীকাল যদি তেলের সরবরাহেও সংকট তৈরি হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে।
তাই এখন প্রয়োজন সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ। কোনো জ্বালানি কখন কতটুকু প্রয়োজন, কোথা থেকে তা নিশ্চিত করা হবে এবং কীভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু রাখা যাবে—এসব বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পরিকল্পনা নিতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানিতে স্বচ্ছতা, সরবরাহ ব্যবস্থায় দক্ষতা এবং অপচয় ও অব্যবস্থাপনা বন্ধ করতে হবে।
বিদ্যুৎ সংকট কেবল অন্ধকারের সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতি, শিল্প, কর্মসংস্থান ও জনজীবনের সমস্যা। তাই সাময়িক সমাধানের পরিবর্তে স্থায়ী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। আলো জ্বালানোর সক্ষমতা থাকলেই হবে না—সেই আলো যেন নিরবচ্ছিন্ন থাকে, তার নিশ্চয়তাও দিতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









