জনপ্রিয় নৌকা বাইচ হলো নদীমাতৃক বাংলাদেশের একটি সুপ্রাচীন ও আনন্দময় জলক্রীড়া প্রতিযোগিতা, যেখানে সুসজ্জিত দীর্ঘ নৌকায় দলবদ্ধভাবে বৈঠা চালিয়ে নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করার রোমাঞ্চকর লড়াই অনুষ্ঠিত হয়। এটি মূলত গ্রামবাংলার আবহমান সংস্কৃতি, যৌথ সম্প্রীতি ও নির্মল বিনোদনের এক অবিস্মরণীয় প্রতীক, যা আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে গভীর আবেগ ও উদ্দীপনা জাগায়।
প্রাচীনকালে রাজা, জমিদার ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিজেদের শক্তি ও বিনোদনের প্রদর্শনী হিসেবে দীর্ঘ আকৃতির শৌখিন ছিপ নৌকা বানিয়ে এই প্রতিযোগিতার গোড়াপত্তন করেছিলেন। নদীমাতৃক এই বদ্বীপ অঞ্চলে জলপথই ছিল যোগাযোগের মূল ভরসা, ফলে দৈনন্দিন যাতায়াত ও কাজের ফাঁকে মাঝি-মাল্লারা নিজেদের দক্ষতা যাচাই করতে এই চমৎকার প্রথার উদ্ভব ঘটান। সময়ের পরিক্রমায় নৌকা বাইচ বাংলার লোকসংস্কৃতির এক গৌরবোজ্জ্বল ও অবিচ্ছেদ্য ঐতিহ্যে রূপ নিয়েছে।
মুঘল আমল কিংবা ব্রিটিশ যুগেও এর রাজকীয় ও সামাজিক বিস্তার লাভ করেছিল নানাভাবে। বর্ষাকালে নদী ও প্লাবিত মাঠে যখন থইথই পানি থাকত, তখন সাধারণ মানুষ কৃষিকাজের ক্লান্তি ভুলে এই উৎসবে মেতে উঠত। এভাবেই কালক্রমে বাইচ আমাদের আবহমান বাংলার কৃষ্টির এক বহমান ও দীপ্তিময় রূপ লাভ করেছে। বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য রক্ষায় নৌকা বাইচ একটি অন্যতম শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত সামাজিক স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে আসছে। গ্রামের সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন প্রান্তর থেকে ছুটে আসা দর্শনার্থীরা এই দিনে নদীর তীরে তিল ধারণের ঠাঁই রাখে না।
ঢোল, করতাল আর সারি গানের মূর্ছনায় চারপাশ মুখরিত হয়ে ওঠে। নৌকা বাইচ হলো মূলত একাধিক দলের মধ্যে সংঘটিত সুশৃঙ্খল ও গতিময় এক নৌচালনা প্রতিযোগিতা। জয়ের উল্লাস ও পরাজয়ের বেদনা এখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এখানে বৈঠার নিখুঁত টান, মাঝিদের শারীরিক কসরত এবং দলনেতার নির্দেশনার চমৎকার সমন্বয় ঘটিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা গন্তব্যে সবার আগে পৌঁছানোর প্রাণপণ চেষ্টা করা হয়। গতি ও শক্তির এক শৈল্পিক ও আনন্দদায়ক যৌথ প্রদর্শন যা দর্শকদের মনে তুমুল শিহরণ ও রোমাঞ্চ জাগিয়ে তোলে। নৌকা বাইচ অত্যন্ত জনপ্রিয় হওয়ার মূল কারণ হলো এর মধ্যে নিহিত রয়েছে বাংলার মাটি ও মানুষের প্রাণের স্পন্দন।
সারি গানের সুর, মাঝিদের সমস্বরের হুংকার এবং তীরের লোকজনের করতালি ও চিৎকার এক জাদুকরি পরিবেশ তৈরি করে। যান্ত্রিক আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া নিখাদ গ্রামীণ আনন্দ, চোখের পলকে মন ভালো করে দেওয়া উৎসবমুখর আবহ এবং অসাধারণ দলগত সংহতি মানুষকে বারবার এই গ্রামীণ ঐতিহ্যের দিকে টেনে আনে। তাই শত প্রতিকূলতা ও আধুনিক বিনোদনের ভিড়েও নৌকা বাইচ বাঙালির অন্তরের মণিকোঠায় পরম আদরে ও সম্মানে আজীবন সজীব ও জনপ্রিয় হয়ে বেঁচে রয়েছে। ঢাকা বিভাগের ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা জেলার দোহার উপজেলার বিখ্যাত ইছামতী নদীতে ১৫ই সেপ্টেম্বর তারিখে।
এই জমজমাট উৎসবে মাঝি-মাল্লারা অত্যন্ত উদ্দীপনার সাথে সমস্বরে পরিবেশন করেন ঐতিহ্যবাহী সারি গান, জারি গান এবং ভাটিয়ালি গান, যা নদীর দুই পাড়ে উপস্থিত হাজারো উৎসুক জনতার মনে ব্যাপক আনন্দ ও উন্মাদনা সৃষ্টি করে থাকে। যেমন -" ঢোল বাজে রে খঞ্জনি বাজে, বুড়িগঙ্গার বুকেতে আজ রঙের মেলা সাজে। সাবাস ভাইরে মারো বৈঠা জোরে, জয়ের মালা নিমু মোরা ঘরে"। "হেইও জওয়ান মারো টান, সাবাড় করো গাঙের পানি। গলুই ধইরা খাড়া মাঝি, দেখাও তোমার কারিগরি!" চট্টগ্রাম বিভাগের রোমাঞ্চকর নৌকা বাইচ উৎসবের আয়োজন করা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার তিতাস নদীর শান্ত ও প্রশস্ত জলে প্রতি বছরের ১০ই অক্টোবর তারিখে।
এই চমৎকার জলক্রীড়ার আনন্দমুখর মুহূর্তে পরিবেশিত হয় মনমাতানো মুর্শিদি গান, সারি গান এবং স্থানীয় মরমী লোকসংগীত, যা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী ক্লান্ত মাঝিদের মনে নতুন শক্তি ও গতি জোগায়। যেমন -"আইজকা মোদের নৌকা বাইচ রে, গাঁয়ের মানুষ আইসাছে। যে জিতবো তার গলায় মালা, ঢাক-ঢোল সব বাজতাছে"। ""তিতাস নদীর শান্ত পানি, আজকে হইলো উত্তাল। মারো রে ভাই বৈঠার বাড়ি, উড়াইয়া দাও পালের পাল!" রাজশাহী বিভাগের প্রাণবন্ত নৌকা বাইচ উৎসবটি বসে নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া উপজেলার বড়াল নদীর বুকে আগামী ২২শে সেপ্টেম্বর নির্ধারিত দিনে। ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিযোগিতার রোমাঞ্চকর ক্ষণে মাঝিমাল্লারা সমস্বরে গেয়ে ওঠেন বিখ্যাত সারি গান, ভাওয়াইয়া গান এবং গ্রামীণ জারি গান, যা উপস্থিত দর্শকদের করতালিতে মুখরিত করে তোলে পুরো নদীর তীরবর্তী এলাকা।
যেমন - "আমার ময়ূরপঙ্খী নাও, ধীরে চালাও সোনার তরী রে। আজকে আমরা বাইচ খেলাইবো ইছামতী নদীরে"। "আঁকাবাঁকা হয় না যেন সোনার মাঝি ভাই ওরে, দেখ দেখ হাজারে হাজার মানুষ আইলো চলনবিলের মেলা রে!" খুলনা বিভাগের বর্ণিল নৌকা বাইচ উৎসবের জমজমাট আসর বসে নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার চিত্রা নদীর তীরে ৫ই অক্টোবর তারিখে। উৎসবের এই আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে শিল্পীরা ও মাঝিরা পরিবেশন করেন সুমধুর ভাটিয়ালি গান, সারি গান এবং পল্লীগীতি, যা নদীর সজীব জলের সাথে মিলে এক অপূর্ব নান্দনিক ও সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি করে। যেমন - "চিত্রা নদীর রূপের ছটা, মাঝিরা সব হেইও টানে। সোনার মেডেল নিমু মোরা, চল চল রে বাও পানে"। ""এক তালে ভাই বৈঠা মারো, পিছে যেন না পড়ি। বাজি ধইরা নামছি রে আজ, পার করুম এই তরী।"
বরিশাল বিভাগের ঐতিহ্যমন্ডিত নৌকা বাইচ উৎসব অনুষ্ঠিত হয় ঝালকাঠি জেলার কাঁঠালিয়া উপজেলার বিষখালী নদীর উন্মুক্ত জলরাশিতে ১৮ই সেপ্টেম্বর তারিখে। এই সুপ্রাচীন প্রতিযোগিতার প্রাণোচ্ছ্বল মুহূর্তে পরিবেশিত হয় ঐতিহ্যবাহী বরিশাল অঞ্চলের কীর্তন, সারি গান এবং জনপ্রিয় লোকসংগীত, যা সমগ্র উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের মাঝে এক পরম আনন্দের জোয়ার বইয়ে দেয়। যেমন-"সুগন্ধার বুহিতে আজ নাওয়ের বাইচ নামছে রে। ধানসিঁড়ির জোয়ানরা সব হেইও হেইও টানছে রে।
"ছলাৎ ছলাৎ বৈঠা পড়ে, দক্ষিণা বাতাস বয়। জয়ী মোরা হইমু আজ, মনে নাইকো কোনো ভয়।" সিলেট বিভাগের দৃষ্টিনন্দন নৌকা বাইচ উৎসবের বর্ণাঢ্য আয়োজন করা হয় সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার সুরমা নদীর পানে ১২ই অক্টোবর নির্ধারিত দিনে। এই রোমাঞ্চকর জলউৎসবে মাঝিমাল্লাদের বৈঠার ছন্দের সাথে পরিবেশিত হয় সুরের জাদুকরী হাসন রাজার গান, বাউল গান এবং ঐতিহ্যবাহী সারি গান, যা হাওর ও নদীর বাতাসকে এক অন্যরকম সুষমায় ভরিয়ে তোলে। যেমন -" নাও বাইও সাবধান হইয়া রে মাঝি ভাই, বাইও সাবধান হইয়া। আল্লাহ্-নবীর নাম লও রে ভাই মনে স্মরণ করিয়া। "সুরমা নদীর পানি ছলাৎ ছলাৎ করে, হামার সোনার নাওখানি তীরের পানে দৌড়ায়। ও ভাইরে ভাই, বৈঠা মারো জোরে, নাও লইমু বায়ে।" রংপুর বিভাগের সাড়া জাগানো নৌকা বাইচ উৎসব অনুষ্ঠিত হয় কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে ২৫শে সেপ্টেম্বর তারিখে। এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিযোগিতায় মাঝিদের উৎসাহ দিতে অত্যন্ত ছন্দে ছন্দে গাওয়া হয় ভাওয়াইয়া গান, সারি গান এবং পল্লিগীতি, যা উত্তরের জনপদের চিরায়ত লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত ও দারুণ রূপ ফুটিয়ে তোলে।
যেমন- "হামার নায়ের বৈঠা নড়ে, ফরফর করিয়া পানি কাটে। আইজকা হামরা জিতমো বাজি, লোক জমছে নদীর ঘাটে। "বাহে তোমরা ঝিমায়ো না, কোমর বান্ধো কষিয়া। জয়ের মেডেল নিয়া যামু, বাড়িত মোরা হাসিয়া"। "ময়মনসিংহ বিভাগের প্রাণোচ্ছ্বল নৌকা বাইচ উৎসবের আয়োজন করা হয় কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলার মেঘনা নদীর মোহনায় ২০শে সেপ্টেম্বর নির্ধারিত দিনে। উৎসবের এই রোমাঞ্চকর ও প্রাণবন্ত মুহূর্তে পরিবেশিত হয় ভাটিয়ালি গান, জারি গান এবং বাউল গান, যা উপস্থিত দর্শক ও প্রতিযোগীদের মনে জলকল্লোলের সাথে সুরের এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি করে। যেমন -" ভাটি অঞ্চলের নাও মোদের, বাতাসে উড়ায় পাল। এক টানেতে যামু রে আজ জয়ের সীমানার ওপার! "কংস নদীর উথাল পানি, নাও দোলে রে টালমাটাল। সাবাস জোয়ান বৈঠা মারো, ধইরা রাখো শক্ত হাল।" নৌকা বাইচ আয়োজন নিয়ে তৈরি হওয়া আধুনিককালের নানামুখী বিতর্ক ও কোন্দলকে পেছনে ফেলে এই চিরন্তন লোকসংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে : বাংলাদেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী সকল নৌকা বাইচের বর্তমান আয়োজনগুলোকে সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ন রেখে নতুন করে নদী, হাওর, খাল ও বিলে এই উৎসব সম্প্রসারণের জন্য প্রথমেই স্থানীয় যুবসমাজ ও জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গ্রামভিত্তিক কমিটি গঠন করতে হবে। প্রতিটি এলাকার প্রবহমান জলধারার তালিকা তৈরি করে সেখানে উৎসবের একটি সুনির্দিষ্ট বাৎসরিক ক্যালেন্ডার প্রণয়ন করা দরকার।
নতুন করে জলক্রীড়া সম্প্রসারণের দ্বিতীয় ধাপে বর্ষা ও শরৎকালে প্রতিটি অঞ্চলের ছোট-বড় নদী, হাওর, খাল ও বিলের নাব্য অবস্থা পরীক্ষা করে ড্রেজিং বা জঞ্জাল পরিষ্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। যার ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি ও দেশীয় পর্যটন শিল্প অত্যন্ত চমৎকারভাবে বিকশিত হতে সক্ষম হবে।
তৃতীয় পদক্ষেপে প্রতিটি উপজেলা ও ইউনিয়নের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে আঞ্চলিক রোয়িং ও নৌকা চালনার প্রশিক্ষণ ক্যাম্প চালু করা যেতে পারে যাতে নতুন খেলোয়াড় তৈরি হয়। যা প্রতিযোগিতাকে আরও বেশি আকর্ষণীয়, পেশাদার এবং উৎসবমুখর করে তুলতে অনন্য ভূমিকা পালন করবে। চতুর্থ ধাপে প্রতিটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের খাল, বিল ও হাওরের নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার লাইভ সম্প্রচার ও প্রচার চালাতে হবে। এর ফলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী খেলাটির পরিচিতি বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে এবং দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরা এসে গ্রামীণ মেলা ও লোকসংস্কৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য স্বচক্ষে উপভোগ করার সুযোগ পাবেন।
পঞ্চম ও শেষ ধাপে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের যৌথ উদ্যোগে নিয়মিত পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করলে প্রতিটি অবহেলিত নদী, হাওর ও বিলে এই ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবিত হয়ে দেশের সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ ও গতিশীল করবে।
পরিশেষে বলা যায়, নৌকা বাইচ শুধু আমাদের নদীর জলকে আলোড়িত করে না, বরং এটি আমাদের জাতীয় ঐক্য, ঐতিহ্য এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে যখন লোকজ সংস্কৃতিগুলো ক্রমশ বিলুপ্তির পথে, তখন নৌকা বাইচের মতো একটি গতিশীল উৎসবকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের সকলের জাতীয় দায়িত্ব।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









