একটি শিশুর কাছে মায়ের মুঠোফোন হয়তো নিছক একটি প্রযুক্তিপণ্য, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার আনন্দের একটি মাধ্যম। কিন্তু কুমিল্লার কোটবাড়িতে ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতীমের ক্ষেত্রে সেই আইফোনকে ঘিরেই এখন উঠে এসেছে এক ভয়াবহ মৃত্যুর প্রশ্ন। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর যে কিশোর আর ঘরে ফিরল না, একদিন পর তার মরদেহ পাওয়া গেল জঙ্গলে।
মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন, অথচ সঙ্গে থাকা আইফোনটির কোনো সন্ধান নেই। একটি শিশুর এমন নির্মম পরিণতি স্বাভাবিকভাবেই শুধু তার পরিবারের নয়, পুরো সমাজের বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো ঘটনা। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে হত্যার উদ্দেশ্য বা হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত—এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়। আইফোন ছিনিয়ে নেওয়াই হত্যার কারণ হয়ে থাকতে পারে—এমন প্রাথমিক ধারণার কথা জানা গেলেও এর সত্যতা তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা বক্তব্য বা অনুমানকে সত্য হিসেবে গ্রহণ না করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের ওপর আস্থা রাখা জরুরি।
ঘটনাটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পরও তাকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকে সাধারণ ডায়েরি করার পাশাপাশি পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। ফোনের অবস্থানও একটি পর্যায়ে শনাক্ত হয়েছিল বলে জানা গেছে। তারপরও অপ্রতীমকে জীবিত উদ্ধার করা যায়নি। ফলে শুধু হত্যাকাণ্ডের রহস্য টন নয়, নিখোঁজ হওয়ার পর উদ্ধার কার্যক্রম কতটা দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর ছিল—সেটিও যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
এখন সবচেয়ে জরুরি হলো একটি নিরপেক্ষ, দ্রুত ও পেশাদার তদন্ত। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের আলামত, ফোনের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য, সম্ভাব্য সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং অপ্রতীমের শেষ সময়ের গতিবিধি—সবকিছু গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করতে হবে। প্রযুক্তিগত ও ফরেনসিক প্রমাণের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন সন্দেহ বা গুজবের ভিত্তিতে হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
অপ্রতীম ছিল সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী, একটি পরিবারের একমাত্র সন্তান। তার মৃত্যু কোনো পরিসংখ্যান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাবা-মায়ের আজীবনের শোক। এই শোকের প্রতি সম্মান দেখানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আবেগনির্ভর প্রতিক্রিয়ার বদলে সত্য উদ্ঘাটন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
একটি আইফোনের মূল্য কখনোই একটি শিশুর জীবনের সমান হতে পারে না। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ যা-ই হোক, এর মধ্য দিয়ে যে নিরাপত্তাহীনতার প্রশ্ন সামনে এসেছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা, নিখোঁজ ব্যক্তির দ্রুত অনুসন্ধান এবং অপরাধের পর কার্যকর তদন্ত—সব ক্ষেত্রেই আরও দায়িত্বশীল ও সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। অপ্রতীমের মৃত্যুর সঠিক কারণ উদ্ঘাটিত হোক, প্রকৃত অপরাধীরা আইনের আওতায় আসুক এবং একটি শোকাহত পরিবার ন্যায়বিচারের আশ্বাস পাক— এটাই এখন সবার প্রত্যাশা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









