দেশে দীর্ঘসময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিদ্যমান, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ, যারা দিন আনে দিন খায়। কারণ একজন শ্রমিক তার সীমিত আয় দিয়ে চার থেকে পাঁচজনের সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষজন যেসব পণ্য জীবনধারণের জন্য ব্যবহার করে, সেগুলোকে সাধারণত গিফেন দ্রব্য বলে। গিফেন দ্রব্য মূলত মোটা চাল, মোটা কাপড়, যা গরিব মানুষের প্রধান খাবার ও পরিধেয়। এগুলোর দাম বাড়লে মানুষের প্রকৃত আয় বা ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। তখন তারা মাছ, মাংস বা ভালো মানের কাপড় কেনার কথা ভাবতে পারে না।
পেট ভরানোর জন্য বা লজ্জা নিবারণের জন্য তারা অন্য সব খরচ কমিয়ে কেবল এই মোটা চাল বা মোটা কাপড়ই আগের চেয়ে বেশি পরিমাণে কিনতে বাধ্য হয়। এক্ষেত্রে অর্থনীতির সূত্রগুলো আর ঠিকঠাক কাজ করে না। সাধারণত দাম বাড়লে চাহিদা কমার কথা, কিন্তু গিফেন দ্রব্যের ক্ষেত্রে দাম বাড়লে চাহিদাও বাড়ে, আবার দাম কমলে চাহিদা কমে। এটি মূলত মানুষের চরম দারিদ্র্য এবং বেঁচে থাকার তাগিদের কারণেই ঘটে থাকে। সুতরাং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ফলে দরিদ্র শ্রেণির জীবনযাত্রার মান চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর থেকে উত্তরণের উপায় কী?
আবার অর্থনীতির পরিভাষায়, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেলে স্থবির অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাওয়ার কথা, অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। কিন্তু দেশে সরকারি হিসাবে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা প্রায় ৩৫ লাখ এবং বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। চলমান জ্বালানি সংকটে নতুন করে আরও ছয় লাখ লোক বেকার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সুতরাং আমাদের দেশে অর্থনীতির সূত্রগুলো ঠিকঠাক কাজ করছে না। অর্থাৎ, আমাদের দেশে ক্ল্যাসিক্যাল স্ট্যাগফ্লেশন চলমান। ক্ল্যাসিক্যাল স্ট্যাগফ্লেশন হলো এমন একটি অস্বাভাবিক ও জটিল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, যেখানে একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা দেখা দেয়। সাধারণ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি বাড়লে বেকারত্ব কমে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। কিন্তু স্ট্যাগফ্লেশনের সময় এর ঠিক উল্টোটি ঘটে, যা আমাদের দেশে চলমান রয়েছে।
চলতি মাসের অর্থাৎ সেপ্টেম্বর মাসের ১৬ থেকে ১৮ তারিখের পত্রিকাগুলো একটু নজর দিলে দেখা যাবে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে এবং পত্রিকাগুলো বেশ গুরুত্ব দিয়ে ছাপাচ্ছে। যেমন, “প্রতি কেজি খোলা আটা ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগে আটার কেজি ছিল ৪৫ টাকা। আর বিক্রেতারা প্রতি কেজি খোলা ময়দার দাম রাখছেন ৬৫-৭০ টাকা। মাসখানেক আগে খোলা ময়দার কেজি ছিল ৫৫-৬০ টাকা। বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৯০-২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেড় মাস আগেও ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ২০ টাকা কম ছিল। এর আগে অবশ্য ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৪০-১৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। রুই, তেলাপিয়া, পাঙাশ, পাবদা প্রভৃতি মাছের দামও অনেকটা উচ্চ মূল্যে স্থির রয়েছে। যেমন, আড়াই-তিন কেজি ওজনের প্রতি কেজি রুই মাছ ৪০০-৪২০ টাকা ও কাতলা ৪২০-৪৪০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। এ ছাড়া আকারভেদে প্রতি কেজি চাষের পাঙাশ ২৫০-৩০০ টাকায়, তেলাপিয়া মাছ ২৫০-২৮০ টাকা এবং পাবদা ৪০০-৪৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে’’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।
আবার পত্রিকার শিরোনামে দেখা যায়, ‘দাম বাড়ল বান রুটির এবং ওজন কমল কেকের’। এই কেক জন্মদিনের কেক নয়, এই কেক হলো ফুটপাতে বিক্রি করা খেটে খাওয়া মানুষের দুপুরের খাবারের একমাত্র উপকরণ। যেখানে দেখা যায়, অধিকাংশ শ্রমিক বা খেটে খাওয়া মানুষ অথবা একজন রিকশাচালক ক্ষুধার তাড়নায় বা ক্ষুধা নিবারণের জন্য এসব পণ্য খেয়ে থাকেন। সেই পণ্যে যদি মূল্যবৃদ্ধি ঘটে, তাহলে বেঁচে থাকার জীবনটা অসহনীয় করে তোলে। সুতরাং রাষ্ট্রকে চিন্তা করতে হবে, দরিদ্র শ্রেণির জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা কীভাবে সহজ করা যায়।
অথচ বেকারি মালিকেরা জানিয়েছিলেন যে গত দেড়-দুই বছরে ময়দা, চিনি, ডালডা, সয়াবিন তেল, গ্যাসসহ অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়েছে। এই কারণ দেখিয়ে তারাও তাদের পণ্যের দাম বাড়ান, যেখানে দেখা যায় নিত্যপণ্যের দাম ১০ থেকে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়। কারণ বেকারি মালিকরা বলছিলেন, তারা তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে মূল্যবৃদ্ধি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এ খাতের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং বৈঠক শেষে বেকারি পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের খরচ যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেন। এরপর রুটি, বিস্কুটের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত রাখার বিষয়ে সম্মতি দেন ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জুলাই মাসের মূল্যস্ফীতির যে তথ্য প্রকাশ করে, তাতে দেখা যায়, জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে। জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি কমার কারণ হিসেবে রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “জুলাইয়ে চাল ও মাংসের দাম কমেছিল। তাই মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। এই দাম কমার তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে।’’
দৈনিক ইত্তেফাকের ১৯ জুন ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, “টিসিবির তথ্য বলছে, গতকাল বাজারে প্রতি কেজিতে দুই টাকা বেড়ে সরু চাল নাজিরশাইল ও মিনিকেট মানভেদে ৭২ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া, মাঝারি মানের চাল পাইজাম/আটাশ ৫৫ থেকে ৬৮ টাকা ও মোটা চাল ইরি/স্বর্ণা ৫২ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হয়, যা এক মাস আগে যথাক্রমে ৫২ থেকে ৬৮ টাকা ও ৪৮ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।‘’
সুতরাং আমরা যেভাবেই বলি না কেন, বাংলাদেশ এক সংকটময় মুহূর্ত পার করছে। এই সংকটময় মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী খেটেখাওয়া সাধারণ মানুষগুলো। যদিও সরকার বিভিন্নভাবে উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে নিম্ন আয়ের মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছে, তার বহিঃপ্রকাশ হলো টিসিবির পণ্য। টিসিবির পণ্য দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। বাজারে লক্ষ্য করা যায়, চালের দাম ঊর্ধ্বমূল্য স্থির বা চালের বাজারের সঙ্গে ধানের মূল্যের তারতম্য ব্যাপক। কৃষকের ধান ২৫ টাকা কেজি না কিনলেও সেই ধান থেকে উৎপাদিত চালের মূল্য কেজিপ্রতি দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে অন্যতম একটি গোষ্ঠী কাজ করে, যাদের আমরা সিন্ডিকেট বলে অভিহিত করে থাকি। অতিসম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে বেকারি আইটেমের মূল্যবৃদ্ধি স্থগিত হয়, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয় একটি বিষয়। তবুও সংশয় থেকে যায়, শেষ পর্যন্ত প্রশংসার মর্যাদা রক্ষা করতে পারবেন তো? খেটে খাওয়া মানুষগুলো নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ে স্বস্তিতে থাকতে চায়। তাদের অনেকেরই দাবি, আয় না বাড়লেও অন্ততপক্ষে খেয়ে-পরে বাঁচার মতো জীবন তাদের কাম্য। রাষ্ট্র অবশ্যই এক্ষেত্রে সফল হবে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখবে।
লেখক : ব্যাংকার ও লেখক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









