মানব সভ্যতার ইতিহাসে শান্তি এক পরম আরাধ্য অমূল্য রত্ন। যুদ্ধবিগ্রহ এবং হিংসায় জর্জরিত পৃথিবীতে শান্তির অন্বেষণ চিরন্তন ঐতিহাসিক সত্য। শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতিসংঘ প্রতি বছর বিশ্ব শান্তি দিবস উদযাপন করে। তবে দেড় হাজার বছর পূর্বে মানবতার মুক্তির দূত এক অনন্য সনদ দিয়েছিলেন। সেই ঐতিহাসিক দিকনির্দেশনা আজও পৃথিবীর বুকে প্রকৃত শান্তি আনার একমাত্র পথ।
ঐতিহাসিক ১০ম হিজরি সনের ৯ই জিলহজ তারিখটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই শুভ দিনে আরাফাতের ময়দানে এক বিশাল মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সেখানে তাঁর জীবনের শেষ ভাষণ দেন। এই চিরন্তন ভাষণটি ইতিহাসে বিদায় হজের ভাষণ নামে সুপরিচিত। এই অলৌকিক ভাষণেই লুকিয়ে আছে বিশ্ব শান্তির আসল স্বর্গীয় চাবিকাঠি। সেদিন আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত ছিলেন প্রায় এক লক্ষাধিক অনুসারী।
সমবেত মানবমণ্ডলীর উদ্দেশ্যে নবীজি (সা.) তাঁর মহামূল্যবান বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি বলেছিলেন, "হে লোকসকল, তোমরা আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করো"। এই বাণীতে নিহিত ছিল সমগ্র মানবজাতির ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মুক্তির মহাসনদ। শান্তির বার্তা দিতে তিনি সমাজ সংস্কারের এক নতুন যুগের সূচনা করেন। নবীজি (সা.) মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তিনি বলেছিলেন, "তোমাদের রক্ত ও সম্পদ পরস্পরের জন্য পবিত্র ও হারাম"। আজকের বিশ্বে প্রতিদিন গড়ে শত শত মানুষ যুদ্ধের কারণে প্রাণ হারাচ্ছে। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বছরে লাখো মানুষ হিংস্র সংঘাতের শিকার হচ্ছে। বিদায় হজের এই নীতি মানলে পৃথিবীতে যুদ্ধের বিভীষিকা চিরতরে দূর হতো। সমাজে শান্তি বিনষ্টের অন্যতম প্রধান কারণ হলো মারাত্মক অর্থনৈতিক শোষণ।
মহানবী (সা.) বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, "আজ থেকে সব সুদ হারাম করা হলো"। বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনীতির বড় অংশ ঋণের সুদের জালে বন্দি হয়ে আছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে কোটি কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্েযর মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে। সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থা চালু করলে সমাজে অর্থনৈতিক সাম্য এবং শতভাগ শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। বর্ণবাদ মানব ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্টতম এবং জঘন্য কালো এক অধ্যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, "কালোর ওপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব বা প্রাধান্য নেই"।
বর্তমান সভ্য সমাজেও জাতিগত বৈষম্যের কারণে চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্ণবাদের কারণে প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। বিদায় হজের সাম্যের বাণী বর্ণবাদের এই বিষাক্ত বীজ চিরতরে উপড়ে ফেলতে পারে। মানবজাতির উৎস যে এক, নবীজি (সা.) তা স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেন। তিনি বলেছিলেন, "তোমাদের সকলের পিতা আদম এবং আদম মাটির তৈরি"। জেনেটিক্স বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যেসব মানুষের ডিএনএ প্রায় শতভাগ অভিন্ন। এই সত্যটি অনুধাবন করলে মানুষের মধ্যকার অহংকার ও আভিজাত্যবোধ লোপ পাবে। তখন সমগ্র বিশ্ব এক শান্তিময় এবং সুসংহত পরিবারে রূপান্তরিত হতে বাধ্য।
নারীর অধিকার ও সম্মান রক্ষায় বিদায় হজের ভাষণ এক ঐতিহাসিক দলিল। প্রিয়নবী (সা.) বলেছিলেন, "তোমরা নারীদের ব্যাপারে অবশ্যই আল্লাহকে ভয় করো"। আধুনিক বিশ্বে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে বহু আইন করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর লাখো নারী নানা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নবীজির এই মোক্ষম উপদেশ নারীর পূর্ণ নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করতে পারে। আমানত রক্ষা করা একটি শান্তিময় সমাজ গঠনের অন্যতম প্রধান শর্ত। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছিলেন, "যার কাছে আমানত রাখা হয়, সে যেন তা ফেরত দেয়"। বর্তমান পৃথিবীতে দুর্নীতি ও বিশ্বাসভঙ্গ আন্তর্জাতিক শান্তিকে চরমভাবে বিঘ্নিত করছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল প্রতি বছর দুর্নীতির এক ভয়াবহ বৈশ্বিক চিত্র প্রকাশ করে। বিশ্বস্ততা বজায় রাখলে সমাজে পারস্পরিক শান্তি ও আস্থা ফিরে আসবে।
মানবতা রক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভ্রাতৃত্ববোধের কোনো বিকল্প খুঁজে পাওয়া যায় না। রাসুল (সা.) ঘোষণা করেছিলেন, "নিশ্চয়ই মুসলমানরা একে-অপরের পরম ভাই"। আন্তর্জাতিক জরিপ মতে, ভ্রাতৃত্বের অভাবে গৃহযুদ্ধে প্রতি বছর অনেক দেশ ধ্বংস হচ্ছে। এই পরম ভ্রাতৃত্বের আদর্শ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিলে সব ধরনের হিংসা ও বিদ্বেষ দূর হবে। পৃথিবীতে শান্তি বজায় রাখতে হলে ধর্মের নামে চরমপন্থা বর্জন করতে হবে। নবীজি (সা.) সাবধান করে বলেছিলেন, "ধর্মের ব্যাপারে তোমরা বাড়াবাড়ি করিও না"। ইতিহাস সাক্ষী, ধর্মীয় উন্মাদনার কারণে পৃথিবীতে বহু রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। বর্তমান যুগেও উগ্রবাদ বিশ্ব শান্তির জন্য এক বিরাট হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। ধর্মীয় পরমতসহিষ্ণুতা ও উদারতা বিশ্বে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করবে।
নিপীড়িত ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষায় এই ভাষণ অত্যন্ত যুগান্তকারী ছিল। আল্লাহর নবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছিলেন, "তোমরা নিজেরা যা খাবে, অধীনস্তদের তা-ই খাওয়াবে"। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মতে, বিশ্বে কোটি কোটি শ্রমিক ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত। শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল সমাজে স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব। বিদায় হজের এই মানবিক দর্শন বিশ্ব শ্রমিকদের প্রকৃত মুক্তি এনে দেবে। শয়তানের সূক্ষ্ম কুপ্ররোচনা সম্পর্কে মহানবী (সা.) উম্মতকে বিশেষ সতর্ক করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "নিশ্চয়ই শয়তান বড় বড় বিষয়ে হতাশ হয়ে পড়েছে"। ছোট ছোট ভুল ও অন্যায় একসময় বড় সংঘাতের রূপ ধারণ করে।
বর্তমান বিশ্বের ছোট ছোট রাজনৈতিক বিবাদগুলো পরে মহাসংকটে রূপ নেয়। শয়তানের এই ফাঁদ থেকে বাঁচলে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধাবস্থা এড়ানো সম্ভব হবে। মানবজাতির সঠিক পথপ্রদর্শনের জন্য তিনি এক শাশ্বত আলোকবর্তিকা রেখে গেছেন। তিনি বলেছিলেন, "আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহ রেখে গেলাম"। এই দুই উৎসের মধ্যেই রয়েছে জীবনের সব সমস্যার চিরন্তন সমাধান।বর্তমান বিশ্বের নৈতিক অবক্ষয় দূর করতে এই দুই মূলনীতি মেনে চলা আবশ্যক। আল-কুরআনের আইন অনুসরণে বিশ্বে শতভাগ শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
বিদায় হজের ভাষণে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল।রাসুল (সা.) বলেছিলেন, "যদি কোনো হাবশী কৃতদাসও তোমাদের নেতা হয়, তবে তোমরা তার আনুগত্য করো"। বিশ্বজুড়ে আজ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও স্বৈরাচারী মনোভাব শান্তি নষ্ট করছে। নেতৃত্বের প্রতি এই আনুগত্য ও সুশাসন সুনিশ্চিত হলে সমাজে বিশৃঙ্খলা দূর হবে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় এই নীতি এক অনন্য মডেল। পাপের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার বিষয়টি এই ভাষণে সুনির্দিষ্টভাবে স্পষ্ট করা হয়েছিল।
তিনি বলেছিলেন, "অপরাধের জন্য কেবল অপরাধী নিজেই এককভাবে দায়ী থাকবে"। প্রাচীনকালে এবং বর্তমান যুগেও একজনের অপরাধে পুরো পরিবারকে শাস্তি দেওয়া হয়। এই অন্যায় প্রথার কারণে সমাজে প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে। বিদায় হজের এই বিচারিক নীতি সমাজে প্রকৃত সুবিচার প্রতিষ্ঠা করবে। ইসলামের আগমনী বার্তার পূর্ণাঙ্গ রূপ এই বিদায় হজের দিনেই ঘোষিত হয়েছিল। সেদিন কুরআনের আয়াত নাজিল হয়, "আজ তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম"। এই পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার মধ্যেই বিশ্ববাসীর সার্বিক শান্তি ও কল্যাণ নিহিত রয়েছে। মানব রচিত আইন যেখানে ব্যর্থ, সেখানে ঐশী আইন শান্তি এনে দেয়। ইসলামকে বাস্তব জীবনে ধারণ করাই বিশ্ব শান্তির প্রধান ও একমাত্র মাধ্যম।
ভাষণটি শুধু উপস্থিত লোকদের জন্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ছিল।রাসুল (সা.) বলেছিলেন, "উপস্থিত ব্যক্তিরা অনুপস্থিতদের কাছে আমার এই বাণী পৌঁছে দাও"। আজ বিশ্বের প্রায় দুইশত কোটির বেশি মানুষ এই বাণীর অনুসারী। বিশ্ব শান্তি দিবসে এই শান্তির বাণী সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। প্রচারের মাধ্যমেই বিশ্বজুড়ে এই আদর্শের আলো ও শান্তি ছড়িয়ে পড়বে। আল্লাহকে সাক্ষী রেখে প্রিয়নবী (সা.) তাঁর মহান দায়িত্ব সমাপ্তি ঘোষণা করেন। তিনি আকাশের দিকে হাত তুলে বলেছিলেন, "হে আল্লাহ, আমি কি পৌঁছে দিয়েছি?"। উপস্থিত জনতা সমস্বরে চিৎকার করে রাসুলের এই অবদানের সত্যতার সাক্ষ্য দিয়েছিল। নবীজির এই আত্মনিবেদিত শান্তি মিশন পৃথিবীর ইতিহাসে এক অতুলনীয় অনন্য অধ্যায়। তাঁর দেখানো পথে হাঁটলেই কেবল পৃথিবী রক্তপাতহীন এক শান্তিময় স্বর্গ হবে।
বিদায় হজের ভাষণ বিশ্ব মানবতার মুক্তির এক শাশ্বত এবং চিরন্তন সনদ। এর প্রতিটি অনুচ্ছেদ বিশ্বের শতভাগ শান্তি নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট। বর্তমান যুগে জাতিসংঘ ও বিশ্বনেতারা শান্তির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তবে বিদায় হজের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ছাড়া বিশ্বে স্থায়ী শান্তি আনা অসম্ভব। এই স্বর্গীয় আলোকেই লুকিয়ে আছে মানবজাতির প্রকৃত মুক্তি ও পরম শান্তি।
আরাফাতের মাঠে জ্বলেছিল আলোর এক অনির্বাণ মহান শিখা, সে আলোতে ঘুচেছিল অন্ধকার আর যত ছিল হিংসার বিভীষিকা। ভেদাভেদ ভুলে মানুষ হয়েছিল এক অভিন্ন ভালোবাসার পরম নীড়, সাম্যের অমিয় বাণীতে নত হয়েছিল অহংকারী মানুষের উন্নত শির। নারীর সম্মান আর শ্রমিকের অধিকার পেল এক নতুন মর্যাদা, সুদ আর জুলুমের অবসান ঘটিয়ে ঘুচলো সমাজের সব জড়তা। সেই ভাষণের চরণে লুকিয়ে আছে চিরন্তন বিশ্ব শান্তির পথ। পরিশেষে বলা যায়, বিদায় হজের ভাষণ বিশ্ব শান্তির এক কালজয়ী মহাকাব্য। এই অলৌকিক বাণীর গভীর তাৎপর্য অনুধাবন করা আজ বিশ্ববাসীর জন্য অত্যন্ত জরুরি।
আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের মূল লক্ষ্য মূলত এই ভাষণের আদর্শের মাঝেই নিহিত। আমরা যদি ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এই ভাষণ পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করি, তবেই পৃথিবীতে শতভাগ শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। আসুন, এই চিরন্তন বাণী বুকে ধারণ করে একটি শান্তিময় বিশ্ব গড়ে তুলি।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









