রাজধানী কি আবারও সন্ত্রাসীদের হাতে জিম্মি হওয়ার পথে? প্রশ্নটি এখন আর আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য নয়; একের পর এক হত্যাকাণ্ড, প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া এবং আধিপত্য বিস্তারের সংঘাত সেই প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। সবচেয়ে ভয়ংকর হলো- খুন হচ্ছে, শুটার ধরা পড়ছে, সহযোগীরা গ্রেপ্তার হচ্ছে; কিন্তু যারা হত্যার নির্দেশ দিচ্ছে, অর্থ জোগাচ্ছে কিংবা দূর থেকে পুরো অপারেশন পরিচালনা করছে বলে তদন্তে অভিযোগ উঠছে, তাদের বড় অংশই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
১১টি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের একটিরও তদন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়নি- এ তথ্যই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে যথেষ্ট। তদন্তে অগ্রগতি থাকতেই পারে, ব্যালিস্টিক রিপোর্টের অপেক্ষাও থাকতে পারে। কিন্তু নাগরিকের প্রশ্ন সোজা: কত দিন অপেক্ষা করতে হবে? রাজধানীর অপরাধের পুরনো খাতা যে আবার খুলেছে, তার আলামত কম নয়। চাঁদাবাজি, ঝুট, ময়লা, ডিশ-ইন্টারনেট, পরিবহন, হাটের ইজারা, ঠিকাদারি, নির্মাণ- যে খাতেই অর্থ ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন, সেখানেই সংঘাতের অভিযোগ।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে পুরনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো যদি নিজেদের আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে থাকে, তবে তা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের জন্যও সরাসরি চ্যালেঞ্জ। আরো ভয়ংকর হচ্ছে হত্যার বদলা হিসেবে হত্যার অভিযোগ। একটি খুনের জবাবে আরেকটি খুন- এভাবে চলতে থাকলে রাজধানী খুব দ্রুত প্রতিশোধের এক অন্ধচক্রে ঢুকে পড়তে পারে। আজ যে গুলি করে একজনকে হত্যা করছে, কাল সেই গুলিই আরেকজনের বুক ঝাঁঝরা করবে। অপরাধীদের কাছে মানুষের জীবন যদি হয়ে যায় ‘হিসাব মেটানোর’ হাতিয়ার, তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকানো কঠিন হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই শুটার নিয়ে নয়, নির্দেশদাতা নিয়ে। একজন ভাড়াটে খুনি ধরা পড়লেই কি হত্যার ব্যবসা বন্ধ হয়? হয় না। কারণ, অস্ত্রধারী বদলানো যায়, কিন্তু পেছনের অর্থ, যোগাযোগ ও নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকলে নতুন শুটার খুঁজে নেওয়া কঠিন নয়। বিশেষ করে বিদেশে অবস্থানরত কথিত মাস্টারমাইন্ডদের বিষয়ে তদন্তে যেসব অভিযোগ উঠে আসছে, সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা জরুরি। অভিযোগ সত্য হলে তাদের স্থানীয় নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে হবে, অর্থের উৎস শনাক্ত করতে হবে এবং সম্ভব হলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। তবে একই সঙ্গে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার প্রবণতাও পরিহার করতে হবে। আইনের শাসনের অর্থ যেমন অপরাধীকে ছাড় দেওয়া নয়, তেমনি প্রমাণের আগেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করাও নয়।
এখন প্রয়োজন পুলিশের ‘অগ্রগতি’র বিবৃতি নয়, দৃশ্যমান ফলাফল। কোন মামলার তদন্ত কোথায়, কেন বিলম্ব হচ্ছে, কোন আলামতের অপেক্ষা চলছে এবং কখন অভিযোগপত্র দেওয়া হবে- এসব বিষয়ে জবাবদিহি থাকা দরকার। তদন্ত বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে অপরাধীরা উৎসাহিত হয়, ভুক্তভোগীর পরিবার হতাশ হয় এবং সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রের ওপর আস্থা কমে। রাজধানীর অপরাধ দমন করতে হলে শুধু গুলি চালানো হাতটি ধরলে হবে না; গুলি কেন চলল, কে অস্ত্র দিল, কে টাকা দিল, কে নির্দেশ দিল, কে আশ্রয় দিল- পুরো শৃঙ্খল ভাঙতে হবে।
রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাবশালী যোগাযোগ কিংবা বিদেশে অবস্থান কোনো কিছুই যেন আইনের নাগালের বাইরে থাকার ঢাল না হয়। রাষ্ট্রের শক্তি কেবল অস্ত্র বা বাহিনীতে নয়; রাষ্ট্রের শক্তি হলো অপরাধের পর অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করার সক্ষমতায়। সেই সক্ষমতার পরীক্ষা এখন রাজধানীতে। শুটার গ্রেপ্তার করে সংবাদ সম্মেলন করা সহজ; মাস্টারমাইন্ডকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোই আসল পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় ব্যর্থতার সুযোগ নেই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









